বাসস
  ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৯

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত: ড. মনজুর হোসেন

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

গোলাম মঈন উদ্দিন

ঢাকা, ৭ জুন, ২০২৬ (বাসস) : পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে কাঠামোগত সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ড. মনজুর বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের ইশতেহারের সঙ্গে বাজেটের অগ্রাধিকারগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে, বাজেটেও সেগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাজেটে সরকারের ইশতেহারে ঘোষিত পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের প্রতিফলন ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ন্যায়ভিত্তিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সুষম আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তি।

তিনি বলেন, কৃষক কার্ড, নারী ক্ষমতায়ন কর্মসূচি এবং গ্রামীণ খাল খনন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মতো অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাজেট কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে এসব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেগুলোর স্পষ্ট প্রতিফলন বাজেটে রয়েছে।’

তিনি আরও জানান, সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোকে একটি সুসংগঠিত নীতিকাঠামোয় রূপ দেওয়ার কাজও করছে।

ড. মনজুর বলেন, ‘আমরা প্রায় উন্নয়ন কৌশল চূড়ান্ত করে ফেলেছি। লক্ষ্য হলো প্রথম অর্থবছর থেকেই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।’

রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক সক্ষমতা
রাজস্ব সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে ড. মনজুর বলেন, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনও বাড়ে। তবে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর পরিশোধে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার।

তিনি বলেন, ‘রাজস্ব বাড়াতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমরা কর সংস্কৃতি উন্নত করতে এবং করের আওতা বিস্তৃত করতে কাজ করছি। এসব উদ্যোগ সফল হলে আর্থিক চাপ কমে আসবে।’

তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রূপান্তরকালীন অর্থনৈতিক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।

‘এখন বিনিয়োগ করা হলে এবং এর সুফল পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক আর্থিক প্রভাব পড়বে না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ড. মনজুর বলেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতিজনিত নয়; সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের মতো বৈশ্বিক কারণও এর জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিকেই কাজ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর আওতা ও আর্থিক সহায়তা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

ড. মনজুর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একই সঙ্গে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বন্ধ ও অচল শিল্পকারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি ইঙ্গিত দেন যে, উৎপাদনমুখী খাতে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থায়ন সহায়তাও দেওয়া হতে পারে।

বিনিয়োগ পরিবেশ ও কর্মসংস্থান
ড. মনজুর বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি জানান, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসা-সংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই সেবা পেতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, আস্থা পুনরুদ্ধার ও ঋণপ্রবাহ বাড়াতে আর্থিক খাতেও সংস্কার চলছে।

তার মতে, সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল তিনটি ধাপে বিন্যস্ত- পুনরুদ্ধার (রিকভারি), পুনঃপ্রতিষ্ঠা (রিস্টোরেশন) এবং ত্বরান্বিতকরণ (অ্যাকসেলারেশন)।

তিনি বলেন, ‘প্রথম বছরের লক্ষ্য হলো কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।’

ব্যাংক খাত সংস্কার ও খেলাপি ঋণ
ব্যাংক খাতের বিষয়ে ড. মনজুর বলেন, খেলাপি ঋণ (এনপিএল) বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার এবং ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।

ড. মনজুর বলেন, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণের পর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘অগ্রাধিকার হলো খেলাপি ঋণ কমানো এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।’

তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি
গ্রামীণ উন্নয়নকে কেন্দ্রীয় নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে ড. মনজুর বলেন, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং শহরমুখী অভিবাসনের চাপ কমাতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘লক্ষ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষ প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করতে পারে।’

জলবায়ু পরিবর্তন ও কাঠামোগত রূপান্তর
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর প্রসঙ্গে ড. মনজুর বলেন, পরিবেশ সুরক্ষাকে জাতীয় পরিকল্পনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি চলমান বনসৃজন কর্মসূচি এবং ভবিষ্যতে কার্বন বাণিজ্যের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা এখন আর আলাদা কোনো খাত নয়; এটি উন্নয়ন পরিকল্পনার কৌশলগত অংশে পরিণত হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্বাভাস
ড. মনজুর বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। তিনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদনের ধীরগতি এবং বিনিয়োগ হ্রাসের কথাও তুলে ধরেন।

তবে লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘আগামী বছর প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আমরা আশা করছি। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমবে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’

তিনি বলেন, বৃহৎ পরিসরের উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতিতে একটি ‘বিগ পুশ’ সৃষ্টি করবে, যা অতীতে বিভিন্ন দেশের পুনরুদ্ধার মডেলের মতো প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
ড. মনজুর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠন এবং ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

তিনি বলেন, অতীতের কঠোর নীতিকাঠামোর পরিবর্তে এখন আরও গতিশীল ও ‘জীবন্ত দলিলভিত্তিক’ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বাস্তবায়ন, জবাবদিহি ও তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য হবে।