বাসস
  ০৯ জুন ২০২৬, ১৩:৫০
আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১৩:৫৯

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণই বাংলাদেশের লক্ষ্য: জিইডি সদস্য ড. মনজুর

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

॥ গোলাম মঈন উদ্দিন ॥

ঢাকা, ৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিও অব্যাহত রয়েছে। সেইসঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা শক্তিশালী করার উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

ড. মনজুর বলেন, ‘প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে। একইসঙ্গে সরকার শুল্ক কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ, শুল্ক প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং বাণিজ্য সহজীকরণে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমও সক্রিয়ভাবে বাস্তবায়ন করছে।’

বাসস’কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. হোসেন বলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে।

মনজুর হোসেন বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পরও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বেসরকারি খাতের দক্ষতা উন্নত করতে হবে, উৎপাদন খরচ কমাতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা মজবুত করতে হবে।’

সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পূর্বাভাস দিয়ে তিনি জানান, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নয়ন ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার হলে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) একটি বড় অংশ নতুন অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রেখে নমনীয় রাখা হয়েছে। 

ড. হোসেনের মতে, অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ এবং সরকারি সম্পদের ওপর চাপ কমাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি সম্পদের ওপর চাপ কমাতে পিপিপি এবং এ ধরনের মডেল গুরুত্বপূর্ণ।’

তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। জিইডি’র এই সদস্য বলেন, একীভূত বিনিয়োগ সহায়তা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে ড. হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতিজনিত ধাক্কাসহ বিভিন্ন সংকট থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে সরকার। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের সহায়তায় নানা কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য।

তিনি আরও জানান বলেন, ‘রাজস্বভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের জীবন-জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার।’

আর্থিক খাত সম্পর্কে ড. মনজুর হোসেন বলেন, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত বহু বছর ধরে চাপের মধ্যে ছিল। প্রায় দেড় বছর ধরে সংস্কার কার্যক্রম চললেও তার দৃশ্যমান সুফল এখনও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মতে আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হল খেলাপি ঋণ। এ সমস্যা মোকাবিলায় সম্পদ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি সামগ্রিক আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।

ড. হোসেন দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, এসব পদক্ষেপ আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সুশাসন জোরদারে সহায়ক হবে।

তিনি আরও বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে মন্থর প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে। এসময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস এবং শিল্প উৎপাদনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

তার ভাষ্য, ‘এটি অর্থনীতির মন্থর প্রবৃদ্ধির পর্যায়। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে জোরালো হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

তিনি জানান, বড় উন্নয়ন বাজেট এবং কঠোর বাস্তবায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার ‘বিগ পুশ’ কৌশল অনুসরণ করছে।

সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সুফল পেতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রকল্প তদারকি জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. হোসেন আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন উন্নত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পিপিপি উদ্যোগ সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন মেয়াদের সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো একটি ‘সক্রিয় দলিল’ হিসেবে কাজ করবে। বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী এটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘এটি কোনো স্থির পরিকল্পনা নয়; এটি একটি গতিশীল দলিল। আগামী পাঁচ বছরে এটি পর্যালোচনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে।’

মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিন ও একবছর মেয়াদি চক্রভিত্তিক স্পষ্ট কর্মসম্পাদন লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে উচ্চপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা থাকবে বলেও জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৭৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশ একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নির্ভর করবে দৃঢ় বাস্তবায়ন সক্ষমতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমুখী নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর।