বাসস
  ১০ জুন ২০২৬, ২১:২৭
আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ২১:৫৩

লিজকৃত জুট মিলগুলো শর্ত পূরণ না করলে ফেরত নেওয়া হবে : পাট সচিব

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। ছবি : বাসস

//মোশতাক আহমদ//

ঢাকা, ১০ জুন, ২০২৬ (বাসস): লিজ নেওয়া সরকারী জুট মিলগুলো নির্ধারিত শর্ত ও সময়সীমা অনুযায়ী উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হলে সেগুলো সরকার পুনরায় ফেরত নেবে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান।

তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোর সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

এ কারণে লিজ দেওয়া মিলগুলোকে অবশ্যই তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

আজ বুধবার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

সচিব বলেন, বিগত বছরগুলোতে সরকারের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি জুট মিল ও টেক্সটাইল মিল বিভিন্ন উদ্যোক্তার কাছে লিজ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যেতে পারেনি কিংবা লিজ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে কিছু মিল ফেরত নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে।

পাট সচিব বলেন, ‘যারা নির্ধারিত উদ্দেশ্যে মিল নিয়েছেন, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় ও গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যেও কার্যক্রম শুরু করতে পারেননি, তাদের কাছ থেকে মিল ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আমাদের লক্ষ্য একটাই, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যারা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না, তাদের পরিবর্তে সক্ষম উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া হবে।’

আব্দুন নাসের খান জানান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) আওতায় থাকা প্রায় ২৫টি জুট মিল এবং ২৫টি টেক্সটাইল মিলকে নতুনভাবে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব মিলের অনেকগুলোর বিশাল জমি, অবকাঠামো এবং কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতিও বিদ্যমান রয়েছে। সরকার এসব সম্পদকে দীর্ঘদিন অলস না রেখে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের কাজে ব্যবহার করতে চায়।

তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে জুট মিল পুনরায় চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে পরিবেশবান্ধব এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্প স্থাপনের জন্য এসব মিল এলাকার জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে উদ্যোক্তাদের কাছে এসব সুযোগ দেওয়া হবে। এতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

সচিব আরও বলেন, ‘সরকার ব্যবসা করবে না, ব্যবসা করবে উদ্যোক্তারা। সরকারের দায়িত্ব হলো নীতিগত সহায়তা দেওয়া, প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। সেই নীতি অনুসারেই আমরা কাজ করছি।’

সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনার বিষয়েও বিস্তারিত তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, লিজ গ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে এমন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অনেক উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছেন এবং সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব প্রস্তাবে কর্মসংস্থানের বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি, সেগুলো পুনর্বিন্যাসের জন্য সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

পাট শিল্পের আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণের প্রসঙ্গ তুলে আব্দুন নাসের খান বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানির পরিবর্তে মূল্য সংযোজিত পাটপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর বর্তমানে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ কাঁচা পাট থেকে যে পরিমাণ আয় হয়, বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করলে তার কয়েকগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘এক টাকা মূল্যের কাঁচা পাট রপ্তানি করলে যে আয় হয়, সেটিকে যদি বহুমুখী পাটপণ্যে রূপান্তর করা যায়, তাহলে এর মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই আমরা এখন ডাইভার্সিফাইড জুট প্রোডাক্টের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছি।’

পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোতে পাটপণ্যের প্রদর্শন ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে পাট, জামদানি ও রেশমপণ্যের বিক্রয় ও প্রচার কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন সচিব। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের চাহিদার একটি বড় অংশের পাট বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। 

তার ভাষায়, ‘আমাদের বার্ষিক প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ প্রয়োজন হয়। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ 

সাক্ষাৎকারে পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন সচিব। তিনি জানান, সরকারের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব স্কুলব্যাগ সরবরাহ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে পাঁচ লাখ ব্যাগ বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ব্যাগের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে বৃষ্টিতে ভিজলেও ব্যাগের কোনো ক্ষতি না হয়।

এছাড়া বস্ত্র খাতের মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। বস্ত্র অধিদপ্তরের অধীন টেক্সটাইল কলেজগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক প্রকৌশলী বের হচ্ছেন। তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও দক্ষতা উন্নয়নে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। 

আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে বিদেশি দক্ষ জনবলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। দেশীয় প্রকৌশলীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করলে তারা এই খাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও কমবে।’

তিনি বলেন, পাট ও বস্ত্র খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। বন্ধ মিলগুলোকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কোনো লিজগ্রহীতা শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে মিল পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।