বাসস
  ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৪৩

আসন্ন বাজেটে মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সামাজিক নিরাপত্তা খাত অগ্রাধিকার পাবে: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

মলয় কুমার দত্ত ও ইসমে আজম

ঢাকা, জুন ৬, ২০২৬ (বাসস): ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আমূল পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু সুরক্ষা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি বিস্তার, ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ নীতি, নারী-শিশু নির্যাতন রোধে জিরো টলারেন্স এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে করেন।
তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের লক্ষ্য একটি মানবিক, সুশাসনভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ‘সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুখাত আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিনে সবকিছু করা সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে পরিধি বাড়ানো হবে। আগামী জুলাই মাস থেকে আমাদের যে নতুন বাজেট শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানেও এই দর্শনের প্রতিফলন থাকবে।’

মন্ত্রী জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এনইসি (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ) সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর উপস্থাপনায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অগ্রাধিকারসমূহ স্পষ্ট করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক এই দুই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সিংহভাগ মূল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সরকার এই ক্ষেত্রগুলোতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘হয়ত একদিনে সব করা সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে কীভাবে এটিকে সম্প্রসারণ করা যায় এবং সেবা বাড়ানো যায়, তা আগামী বাজেটেই দেখতে পাবেন। বাজেটে সেজন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।’

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ভাতাকে কেবল অনুদান হিসেবে দেখতে রাজি নন মন্ত্রী। তিনি এটিকে একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। 

ডা. এজেডএম জাহিদ বলেন, ‘কাউকে টাকা দিয়ে অলস বানিয়ে দেওয়া এই ভাতার উদ্দেশ্য নয়। এই টাকাটা আসলে এক ধরনের বিনিয়োগ। এই অর্থ পাওয়ার পর পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলের খরচ, পোশাক বা পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তারা হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল পালন, বৃক্ষরোপণ এবং সবজি চাষের মতো আয়বর্ধক কাজে উদ্বুদ্ধ হবে।’

এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক চক্র ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ইনডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা পরোক্ষ বিনিয়োগ। একজন সুবিধাভোগী যখন এটির মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করবেন, তখন তা জিডিপিতে অবদান রাখবে। আবার তিনি যখন সেই টাকা দিয়ে খাদ্য, কাপড় বা বই কিনবেন, তখন তা অন্য আরেকজনের আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করবে। যাদের নিজস্ব পুঁজি বা বিনিয়োগ করার সামর্থ্য নেই, এই টাকা দিয়ে সরকার তাদের একটু সহযোগিতা করছে যাতে পর্যায়ক্রমে দেশের দারিদ্র্েযর হার কমে আসে। 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আরও জানান, দেশের ৫০ ভাগের বেশি নারী এবং প্রায় ৩২ ভাগ শিশু। এদের যদি সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তবেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

দেশের যুবসমাজ তথা ‘জেনারেশন জেড’ এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে ডা. জাহিদ জানান, সরকার বেকারত্ব দূরীকরণের চেয়ে ‘কর্মসংস্থান’ সৃষ্টিতে বেশি বিশ্বাসী।

তিনি বলেন, ‘আমাদের চলতি মেয়াদে আমরা প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই বিশাল যুব জনগোষ্ঠী আমাদের সম্পদ। অনেকে একে লায়াবিলিটি বা বোঝা বলতে পারেন, কিন্তু তা ঠিক নয়। এই তরুণদের যত্ন নেওয়া, তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে দেশের কাজে লাগানো এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় কাজ।’

প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে  সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.৬ থেকে ২.৮ শতাংশ (কারো মতে এটি আরও বেশি) মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার। ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে সংখ্যাটি অনেক বড়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে কোনো কর্মসূচি সফল করা সম্ভব নয়। তাই সরকারের প্রতিটি সামাজিক কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তাদের প্রতিবন্ধকতা অনুযায়ী উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা দিয়ে সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের জন্য আমাদের বিশেষ কর্মসূচি রয়েছে, যা বর্তমান সরকারের আমলে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। আমাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতেও প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ রয়েছে।’

তিনি আরও জানান, একই সঙ্গে দেশের ভূমিহীন, গৃহহীন, ভিক্ষুক এবং পিছিয়ে পড়া আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষদের আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য সরকারের ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। 

ডা. এজেডএম জাহিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এবারের বাজেটে বরাদ্দ বেশি থাকবে। আগামী জুলাইয়ে বাজেট সংসদে উপস্থাপিত হলেই দেশবাসী তা জানতে পারবেন।’

বর্তমান সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার প্রকল্প হল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এই প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ ও শহুরে—অর্থাৎ দেশের সমাগ্রিক জনসংখ্যার যে পরিবারগুলোতে নারীরা প্রধান হিসেবে আছেন, তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অধিকতর ক্ষমতাশালী এবং স্বাবলম্বী করাই এই কার্ডের মূল উদ্দেশ্য। মূলত একটি পাঁচসদস্য বিশিষ্ট পরিবারের নারী প্রধানকে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে।’

কার্ডের সুবিধা বণ্টন প্রক্রিয়ার নিয়ম ব্যাখ্যা করে ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যিনি ফ্যামিলি কার্ড পাবেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক নিরাপত্তার অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। তবে তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি অন্য কোনো সুবিধা পেয়ে থাকেন, তা যথারীতি অব্যাহত থাকবে।’

কর্মসূচিটির স্বচ্ছতা ও বিস্তৃতির বিষয়ে মন্ত্রী আশ্বস্থ বলেন, সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ‘ইউনিভার্সাল’ বা সার্বজনীন। একটি গ্রাম, ইউনিয়ন বা উপজেলায় যারা এই সুবিধা পাওয়ার প্রকৃত যোগ্য, তারা সবাই পাবেন। এখানে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা হচ্ছে, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ থাকবে না। সরাসরি সরকার থেকে জনগণের কাছে অর্থাৎ ‘জিটুপি’ (সরকার থেকে জনগণ) পদ্ধতিতে সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পের পাইলট ফেজে ৮০ হাজার পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ফেজ শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের মধ্যে তৃতীয় ফেজের কাজ সম্পন্ন হবে। ফলে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সারাদেশে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে এককভাবে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের টার্গেট পপুলেশন বা লক্ষ্যমাত্রা হল ৪০ লাখ ২০ হাজার পরিবার। 

মন্ত্রী বাসস’কে জানান, আসন্ন ২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই দেশের প্রতিটি উপজেলায় ব্যাপকভাবে এর বিস্তৃতি ঘটানো হবে এবং আগামী চার বছর মেয়াদের মধ্যে এই কর্মসূচিটি পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই লক্ষ্য অর্জনে সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ, জনপ্রশাসন, কৃষি এবং আইসিটি বা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেন্দ্রীয়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।

ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তার সব ধরনের ভাতা একক কার্ডের অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ প্রমিশনে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে তিন থেকে চার বছর সময় লেগে যাবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত এই চিকিৎসক আরও স্পষ্ট করেন যে, কার্যক্রমটি মূলত এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) ভিত্তিক হবে। এই একক কার্ড বা উইন্ডোটি নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকারের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখা এবং সুবিধা বিতরণকারী সব মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ব্যবহার করতে পারবে। বর্তমানে তথ্য সংগ্রহের কাজ ম্যানুয়ালি করার পর তা ডিজিটাল সিস্টেমে এন্ট্রি দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ডাটাবেজ তৈরি করাই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য। বর্তমান এনআইডি সিস্টেমে এটি সরাসরি করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে ঘটে যাওয়া কিছু মর্মস্পর্শী নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এবং আইনগত কাঠামো নিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করেছে।

মানুষকে আইন, তাদের অধিকার এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন করতে আমরা খুব সহসাই দেশব্যাপী একটি বুস্ট-আপ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছি বলেও ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সেখানে জনপ্রতিনিধি, নীতি-নির্ধারকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করা হবে।

এই সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন বিশিষ্ট এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘অন্যায়, ধর্ষণ ও মাদকের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াসহ সব ধরনের সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কর্মীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগে আমরা গণমাধ্যমের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করি।’

আইনি কাঠামোর দুর্বলতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে এজেডএম জাহিদ বলেন, ‘আইনি কাঠামোর দুর্বলতা খুব কম। আসল সমস্যা আইনের সঠিক প্রয়োগ আর মানুষের মানসিকতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে। মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো জরুরি, যাতে প্রত্যেকে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ জাগ্রত করতে পারে। এটি শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; সরকারি দল, বিরোধী দল এবং দেশের সাধারণ নাগরিকসহ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।’