শিরোনাম

বরুন কুমার দাশ ও আব্দুর রউফ
ঢাকা, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ইউরোলজি চিকিৎসায় ব্যয়বহুল রোবটিক সার্জারি আবিষ্কৃত হলেও পেট না কেটে ল্যাপারোস্কপিক ও মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি এখনো জনপ্রিয়। দেশের সব জেলায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বল্পমূল্যে এই উন্নত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস (BAUS)--এর সদস্য সচিব এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস (পি সি বিশ্বাস) বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানান।
ইউরোলজি সেবার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ ইউরোলজিক্যাল সমস্যাগুলো আলাদাভাবে বুঝতেন না। তখন জেনারেল সার্জন বা মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরাই এসব রোগের চিকিৎসা দিতেন। তবে বর্তমানে সচেতনতা বেড়েছে। পেটের দুপাশে, তলপেটে বা কোমরে ব্যথা কিংবা প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দিলেই এখন রোগীরা সরাসরি ইউরোলজিস্টদের কাছে আসছেন।’
এছাড়া অন্য রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিডনি, মূত্রথলি, মূত্রনালী, প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বা পুরুষ প্রজনন অঙ্গের সমস্যা ধরা পড়লে অন্য চিকিৎসকরাও এখন রোগীদের ইউরোলজিস্টদের কাছে রেফার করছেন। ফলে বর্তমানে আমাদের দেশে ইউরোলজি সেবা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইউরোলজির আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ইউরোলজির বেশিরভাগ চিকিৎসাই অপারেশন নির্ভর। তবে কিছু কিছু রোগের ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করা যায়, যেমন ইনফেকশনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। পাথর বা টিউমারের ক্ষেত্রে এখন আর আগের মতো পেট কেটে বা কিডনি কেটে অপারেশন করার প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে অত্যাধুনিক ‘এন্ডোস্কপিক’ বা ‘ন্যাচারাল অরিফিস’ পদ্ধতির মাধ্যমে মূত্রনালী দিয়ে যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে কিডনি পর্যন্ত পৌঁছে চিকিৎসা করা যায়। শরীরের বাইরে থেকে ছিদ্র করে পাথর বের করার পদ্ধতিও এখন প্রচলিত।
এ সময় তিনি ইউআরএস, আইসিপিএল, লেজার, পিসিএনএল এবং আরআইআরএস-এর মতো অত্যাধুনিক চিকিৎসাগুলোর কথা তুলে ধরেন।
ডা. পি সি বিশ্বাস বলেন, কিডনি বা মূত্রথলির টিউমার ও ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এখন পেট না কেটে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে।
রোবটিক সার্জারি নিয়ে জানতে চাইলে ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উন্নত বিশ্বে এখন রোবটিক সার্জারি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ক্যান্সার বা টিউমার অপারেশনের ক্ষেত্রে এটি ল্যাপারোস্কপির চেয়েও বেশি উপকারী। রোবটিকের মাধ্যমে ক্যান্সার সার্জারিটা এত সূক্ষ্মভাবে করা যায় যে, রোগীকে পরিপূর্ণভাবে ক্যান্সারমুক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমাদের আর্থসামাজিক অবকাঠামোতে রোবটিক সার্জারি একটু ব্যয়বহুল। কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসার মান ও ভালো ফলাফলের কথা চিন্তা করলে রোবটিক সার্জারির প্রয়োজন আছে।
বিশেষ করে টার্সিয়ারি লেভেলে সরকারি পর্যায়ের পাইওনিয়ার প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেন্টার অব এক্সিলেন্স বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ও ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব কিডনী ডিজিজেস এন্ড ইউরোলজি (নিকডু) এর মতো জায়গাগুলোতে আগামী দিনের সেবার জন্য রোবটিক সার্জারি থাকা প্রয়োজন।
ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় প্রথাগত ওপেন সার্জারির পরে ল্যাপারোস্কপিক ও মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সব রোগী ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেবে, এটা সমাধান নয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস্-এর পক্ষ থেকে তাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেটি হলো, ল্যাপারোস্কপিক ও মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারিকে ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে বিভাগীয় ও জেলা শহরের মেডিকেল কলেজগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যে তারা স্থানীয় ফ্যাকাল্টি বা প্রশিক্ষক তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ঢাকার বাইরে ছোট ছোট কর্মশালা (ওয়ার্কশপ) আয়োজনের মাধ্যমে সেখানকার ইউরোলজিস্টদের প্রশিক্ষিত করা হবে, যাতে তারা নিজ জেলাতেই কিডনি, মূত্রথলি বা নালীর পাথর ও টিউমারের আধুনিক চিকিৎসা দিতে পারেন। এতে রোগীরা নিজ এলাকায় স্বল্পমূল্যে উন্নত সেবা পাবেন।
কিডনি ও ইউরোলজিক্যাল রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢামেকের এই অধ্যাপক বলেন, অনেকের ধারণা অনেক বেশি পানি পান করলে কিডনি ভালো থাকে, কথাটি ঠিক নয়। মানুষের বয়স, ওজন ও শারীরিক কাঠামো কর্মপরিবেশ অনুযায়ী পরিমিত পানি পান করতে হবে।
ডা. পি সি বিশ্বাস বলেন, পানি বেশিও খাওয়া যাবে না, আবার কমও না। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে পানি কম বা বেশি খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। যারা গরম এলাকায় কাজ করেন বা যাদের শরীরে ঘাম বেশি হয়, তাদের পানি পানের পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে প্রস্রাবের প্রবাহ ঠিক থাকে। প্রস্রাবের প্রবাহ ঠিক থাকলে প্রস্রাবের ইনফেকশন ও পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
তিনি বলেন, সুস্থ থাকার জন্য আমাদের দেশের সাধারণ খাবার, যেমন- ডাল, ভাত, মাছ ও তরকারিই যথেষ্ট।
তবে ইউরোলজিক্যাল রোগ থেকে দূরে থাকতে হলে রেড মিট বা লাল মাংস (গরু ও খাসির মাংস) খুব বেশি খাওয়া যাবে না। কারণ ইউরোলজিক্যাল ডিজিজের ক্ষেত্রে এর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে।
এছাড়া মাটির নিচের সবজি, যেমন- আলু, মূলা, গাজর, কচু এবং বিচি জাতীয় খাবার বা ডাল জাতীয় খাবার অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব খাবারে উচ্চ মাত্রায় চর্বি ও লবণের আধিক্য থাকে, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলেও জানান তিনি।
নানা ধরনের ক্যামিকেলসের ব্যবহার ও ধূমপানকে মূত্রথলির ক্যান্সারের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। সেই সঙ্গে যাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে যথাযথ নিয়ম মানার পরামর্শ দেন তিনি। কেননা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি কিডনির ক্ষতি করে।