বাসস
  ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৮

লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস-বি : ডা. শাকিল গনি

ঢামেক হাসপাতালের হেপাটোলজী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এ বি এম শাকিল গনি। ছবি : বাসস

ঢাকা, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশে লিভার ক্যান্সারের জন্য ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ এই ভাইরাসটি বহন করছেন। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এতে আক্রান্ত। সহজভাবে বললে, প্রতি তিনজনে একজন কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশই জানে না যে তারা ভাইরাসটি বহন করছেন। ফলে তারা অজান্তেই সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস হিসেবে কাজ করছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ বি এম শাকিল গনি সম্প্রতি ‘বাসস’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান। তিনি লিভার রোগের প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা এবং জনসচেতনতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সংক্রমণের চিত্র ও ঝুঁকি বিষয়ে ডা. শাকিল গনি জানান, ‘অ্যান্টি এইচবিসি টোটাল’ (Anti HBc Total) পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি তিনজনে একজন মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের অ্যান্টিবডি রয়েছে। এর মানে হলো, জীবনের কোন না কোন সময় এই বিপুলসংখ্যক মানুষ হেপাটাইটিস বি-ভাইরাসের সংক্রমনের শিকার হয়েছেন নিজের অজান্তেই।

অন্যদিকে, হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসের প্রকোপ তুলনামূলক কম। দেশের প্রায় ০.৮৪ শতাংশ বা ১৫ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। মোট লিভার ক্যান্সারের ৫ শতাংশের জন্য দায়ী এই ভাইরাস। তবে আশার কথা হলো, মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়া প্রতি ১০ জন রোগীর একজন কোন না কোন লিভার রোগে আক্রান্ত হলেও, এসব রোগের অধিকাংশ রোগই প্রতিরোধযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। আরও ইতিবাচক দিক হচ্ছে, লিভার রোগের প্রায় সব আধুনিক চিকিৎসাই বর্তমানে বাংলাদেশে সম্ভব।

হেপাটাইটিস কী ও কেন হয়? 
ডা. গনি জানান, লিভারের প্রদাহকে (ব্যাথা)  চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় হেপাটাইটিস। কিছু নির্দিষ্ট ভাইরাস রয়েছে, যেগুলো কেবল লিভারকেই আক্রমণ করে। এই ভাইরাসগুলো লিভারের কোষের ভেতরে বংশবিস্তার করে কোষ ধ্বংস করে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। দীর্ঘদিন সংক্রমণ চলতে থাকলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এমনকি লিভার ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এই ধরনের দুটি মারাত্মক ভাইরাস হলো হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি।

হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শাকিল বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি প্রধানত রক্ত ও দেহের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন, দূষিত সিরিঞ্জ বা সূঁচ ব্যবহার, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে শিশুর দেহে (জন্মের সময়), অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থানের সংস্পর্শ, দাঁতের চিকিৎসায় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা ও ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং। এমনকি রক্তে শর্করা (ডায়াবেটিস) মাপার যন্ত্রের সূঁচ শেয়ার করার মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে। তবে সাধারণভাবে একসঙ্গে খাওয়া, বসবাস বা সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় না। এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান ও দাঁতের চিকিৎসকদের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। কারণ তাদের প্রতিদিনই রোগীর রক্ত ও দেহতরলের সংস্পর্শে কাজ করতে হয়। 

পরিসংখ্যান বলছে, সূঁচ বা ধারালো জিনিসে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর হেপাটাইটিস-বি এর ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি ২৩ থেকে ৬২ শতাংশ হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় ১.৮ শতাংশ। এ কারণেই সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য হেপাটাইটিস বি টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শাকিল গনি বলেন, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষকে সংক্রমণের উপায়, প্রতিরোধ ও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা অযথা ভয় বা সামাজিক গোপনীয়তা না রেখে রোগ সম্পর্কে পরিবারকে জানাতে উৎসাহ দেওয়া। ৪০ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করা। শিশু জন্মের পরপরই এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য হেপাটাইটিস বি টিকা নিশ্চিত করা নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ও রক্ত পরীক্ষা দ্রুত শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে জটিলতা প্রতিরোধ।

হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রন্ত হলে চিকিৎসা নেই এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়, তেমনি হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসাও অনেক সময় দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই চিকিৎসাই লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করে। তবে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ যত্রতত্র ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

হেপাটাইটিস-বি থাকলে অবশ্যই নিয়মিত লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে রোগীদের জন্য পরামর্শ দিয়ে ডা. শাকিল বলেন, ২০ বছরের বেশি বয়সীদের সবারই হেপাটাইটিস-বি টিকা নেওয়া উচিত। মাত্র তিন ডোজে প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া যায়। দাঁতের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার শুধুমাত্র অনুমোদিত ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে করান। নিরাপদ পানি পান করুন। জীবনে কখনো রক্ত নিলে বা বড় কোনো অপারেশন হয়ে থাকলে অন্তত একবার হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষা করান। ভালো খবর হলো হেপাটাইটিস-সি এখন মাত্র তিন মাসের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য আর এর ওষুধ বাংলাদেশে সহজলভ্য।

হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ঢামেকের এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, রোগী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণের পদ্ধতি, প্রতিরোধ ও টিকার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সাধারণভাবে রোগীর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা, মেলামেশা বা চলাচলে কখনো হেপাটাইটিস ছড়ায় না। তাই এটিকে ভয় পেয়ে বা পরিবারে গোপন রাখা সকলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সচেতনতা, সময়মতো টিকা এবং নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থাই পারে এই নীরব ঘাতক থেকে আমাদের রক্ষা করতে।