বাসস
  ০২ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৩

বারবিকিউ শিখেই নতুন জীবনের স্বপ্ন চীনা তরুণদের

ফাইল ছবি

ঢাকা, ২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বারবিকিউ চুলার সামনে ঝুঁকে একের পর এক গরুর মাংসের রসালো টেন্ডন ও নানা উপকরণ শিকে গেঁথে নিখুঁতভাবে পুড়ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। দক্ষিণ চীনের ইউয়েয়াং বারবিকিউ একাডেমিতে তারা এমন দক্ষতা আয়ত্ত করছেন, যা ভবিষ্যতে তাদের কোনো রেস্তোরাঁয় চাকরি কিংবা নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

চীনের ইউয়েয়াং থেকে এএফপি জানায়, গাড়ি শিল্পে এক দশক কাজ করা সাবেক কারখানাশ্রমিক ৩৪ বছর বয়সী ঝাং তেংফেই চাকরি হারানোর পর নতুন জীবনের আশায় চীনের প্রথম বিশেষায়িত বারবিকিউ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন।

হুনান প্রদেশের এ একাডেমিতে এএফপিকে তিনি বলেন, ‘চাকরি হারানোর পর কিছুদিন কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’

হালকা ঝলসানো কাবাবের শিক প্রশিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে মূল্যায়নের অপেক্ষায় থাকা ঝাং জানান, তিনি এখন নিজের শহর হেনান প্রদেশে একটি বারবিকিউ স্টল খুলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে স্বাবলম্বী হতে চান।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়া এবং প্রচলিত শিল্পে ভালো বেতনের চাকরি কমে যাওয়ায় ঝাংয়ের মতো অনেক শ্রমজীবী মানুষ নতুন দক্ষতা অর্জনের পথে হাঁটছেন।

তাদের জন্য এক মাসের এ বারবিকিউ কোর্স, যার ফি ৫ হাজার ৮০০ ইউয়ান (প্রায় ৮৫০ মার্কিন ডলার), নতুন কর্মসংস্থানের আশা জাগাচ্ছে। কোর্স শেষে তারা বাবুর্চি বা রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবেন।

ইউয়েয়াং শহরের একটি শান্ত লেকের তীরে অবস্থিত একাডেমিতে সপ্তাহে ছয় দিন প্রশিক্ষণার্থীরা বেগুন থেকে শুরু করে শূকরের পেটের মাংস পর্যন্ত বিভিন্ন উপকরণ রান্না, রান্নাঘর পরিচালনা, পণ্যের বিপণন এবং লাভজনক ব্যবসা পরিচালনার কৌশল শিখছেন।

গত এপ্রিলেই প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াং জংফু আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার দক্ষ বারবিকিউ শেফ তৈরির লক্ষ্য ঠিক করেছেন।

প্রশিক্ষণ শেষে সরাসরি ব্যবসা

এ কোর্সের প্রতি আগ্রহও ব্যাপক। জুন মাসের দ্বিতীয় ব্যাচে মাত্র ৪৫টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৪ হাজারের বেশি।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য পড়াশোনা শেষ করা তরুণ, চাকরি হারানো নির্মাণশ্রমিক এবং নিজেদের ব্যবসায় নতুনত্ব আনতে আগ্রহী বারবিকিউ দোকানের মালিকরাও।

জিয়াং বলেন, ‘বারবিকিউ ব্যবসায় খুব কম বিনিয়োগ লাগে এবং ঝুঁকিও কম। একটি বারবিকিউ চুলাই একটি পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে। তাই বেকারত্ব কমানোর এটি খুবই কার্যকর উপায়।’

প্রথম ব্যাচের কয়েকজন ইতোমধ্যে চীনের বিভিন্ন শহরে স্ট্রিট ফুডের দোকান খুলেছেন। একজন আবার ভিয়েতনামে রেস্তোরাঁও চালু করেছেন।

২৪ বছর বয়সী শু শুয়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিপণনের চাকরি ছেড়ে এ কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। কোর্স শেষে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের রেস্তোরাঁর প্রচারণা চালাতে চান।

চীনের টিকটক সংস্করণ ‘দৌইন’-এর জন্য ভিডিও সম্পাদনার ক্লাস শেষে তিনি বলেন, ‘বারবিকিউর সঙ্গে আমার আগের কাজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কাজে লাগাতে পারব, যা আমার জন্য বাড়তি সুবিধা হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই একাডেমির কারণে খুব দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব। মাত্র এক মাসের মধ্যেই ব্যবসায় নেমে পড়া যায়।’

সকালে তাত্ত্বিক ক্লাসের পর বিকেলে হয় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।

একটি শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষক লুও দুওচেং শিক্ষার্থীদের দেখাচ্ছিলেন কীভাবে গরুর মাংস সঠিকভাবে কেটে, মসলা মাখিয়ে একই আকারের শিকে গাঁথতে হয়।

ক্লাস শেষে তিনি বলেন, ‘বারবিকিউ এমন কোনো কাজ নয়, যা একবার দেখে করলেই হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘চুলায় খাবার কীভাবে উল্টাতে হবে, স্বাদের মান কীভাবে ধরে রাখতে হবে এবং পরিবেশন যেন আকর্ষণীয় হয়—সবকিছুই সঠিকভাবে জানতে হয়।’

তীব্র প্রতিযোগিতার বাজার

প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীদের বিশেষজ্ঞ বিচারকদের সামনে রান্না করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

তবে সনদ পেলেই সাফল্য নিশ্চিত নয়।

তারা এমন এক অর্থনীতিতে প্রবেশ করবেন, যেখানে ভোক্তা চাহিদা দুর্বল। মে মাসে চীনে টানা তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো খুচরা বিক্রি কমেছে এবং খাদ্যসেবা খাতের আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

একাডেমির প্রশিক্ষক ও রেস্তোরাঁ মালিক ঝু ঝিলং বলেন, ‘এ খাতে প্রতিযোগিতা অনেক, কারণ ব্যবসা শুরু করার বাধা খুব কম।’

তিনি বলেন, ‘আগে শুধু ভালো একটি জায়গা পেলেই চলত। কিন্তু এখন বিপণন, ব্যবস্থাপনা এবং ইন্টারনেটে ক্রেতা টানার কৌশল জানতে হয়। এগুলো না জানলে শুধু ভালো রান্না করেই লাভ নেই।’

তবুও আশাবাদী ঝাং তেংফেই।

তিনি বলেন, ‘খাবার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই আমি মনে করি, এ খাতে ভবিষ্যৎ অবশ্যই ভালো।’

এ কথা বলেই তিনি আবার চুলার সামনে ফিরে যান, পরের দফার শিক প্রস্তুত করতে।