বাসস
  ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০২
আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৮

স্টেপ টু হিউম্যানিটি বাংলাদেশের সংলাপ: হামের বিস্তার রোধে জরুরি জনসচেতনতার আহ্বান

দেশে হামের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় জনসচেতনতারআহ্বান জানান বক্তারা ছবি: বাসস

ঢাকা, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : দেশে হামের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালীকরণ এবং নীতিগত ঘাটতি দূরীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

স্টেপ টু হিউম্যানিটি বাংলাদেশের উদ্যোগে 'হাম নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক নীতি সংলাপ: টিকাদান কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতা জোরদারকরণ' শীর্ষক এই ভার্চুয়াল সভাটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট প্রবাসী সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদ। তিনি তার গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে বলেন, দেশে হামের পুনরুত্থান শুধু জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলনও হতে পারে।

সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) সাবেক পরিচালক ড. কামরুল হাসান। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ডা. সেলিনা আক্তার।

ডা. সেলিনা বলেন, গত দুই বছরে দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিশ্চিত ও উপসর্গভিত্তিক মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২১৫-তে পৌঁছেছে। 

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পুষ্টিকর খাদ্য, বিশেষ করে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিতকরণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। 

একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, হামের কারণে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কখনও অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে এবং লক্ষণ প্রকাশের আগেই এটি ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগজনকভাবে টিকাপ্রাপ্ত শিশু এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেলোয়ার জাহিদ দ্রুত দেশব্যাপী গণটিকাদান জোরদার, টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সরকার ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্টেপ টু হিউম্যানিটির পক্ষ থেকে সংক্রামক রোগ কর্নার চালু, শিশুদের জন্য ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি সংগঠনটি জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করবে।

নারীনেত্রী নাসিমা আক্তার গুজব ও ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং দারিদ্র্য বা বৈষম্যের কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

সভাপতির বক্তব্যে ড. কামরুল হাসান বলেন, স্বাস্থ্য কেবল একটি সেবা নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।

তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা তুলে ধরে বলেন, শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার পূর্ণতাই প্রকৃত স্বাস্থ্য। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল সবার জন্য নিরাপদ ও সমান জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

সংলাপে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে: জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ৬ মাস বয়স থেকে টিকাদান নীতিগতভাবে বিবেচনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, রিয়েল-টাইম ডাটা মনিটরিং এবং গণসচেতনতা ও কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।

সভার সঞ্চালক প্রকৌশলী কোরা হাসান ইভানা কমিউনিটি সংযোগ ও সামাজিক সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে গণমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন।

সংলাপে অংশ নেওয়া বক্তারা একমত হন যে, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও শিশুমৃত্যুর ঘটনা বাড়া একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি শুধু স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। তাই এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার।

সভায় আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক এম. ফিরোজ ও এএসএম শামসুল হাবিব।