বাসস
  ১১ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪০

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার

আজ ঢাকা ক্লাবে এফইআরবি আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতে সংকট : সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ছবি: বাসস

ঢাকা, ১১ আগস্ট, ২০২৬(বাসস): জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট মোকাবিলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। 

তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আজ ঢাকা ক্লাবে জ্বালানি খাতের সংকট সম্ভাবনা উত্তরণের উপায় শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। 

তিনি আরো বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দুইভাবেই বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছে। জাতীয় সংসদকে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনা ও মতামত বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এলপিজি খাতেও সরকারের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করলেও বাজারে সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারের ভূমিকা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল কাজে লাগিয়ে সরকার নিজস্বভাবে এলপিজি আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, মাতারবাড়িতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। 

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করে কাজ শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু অর্থ থাকলেই তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। দেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে এলএনজি টার্মিনাল ও অবতরণ সুবিধা থাকা জরুরি। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা।

তিনি আরো বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও এই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমছে। ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি সমাধান করতে না পারলেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে কাজ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সীমিত সম্পদ দিয়ে সরকারকেও বিভিন্ন খাতে সমন্বয় করে চলতে হচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তারা বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এ সময় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহের কথাও জানানো হয়। একটি বিদেশি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী বৃহৎ পরিসরে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

তিনি আরো বলেন, এলএনজি ও এলপিজির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। 

এজন্য নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে বিডিং রাউন্ড চালু করা হয়েছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যে তা শেষ করার আশা করা হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব কেন্দ্র প্রায় ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালনা করা গেলে তা একটি আদর্শ পরিস্থিতি হবে। তবে আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের ভূগর্ভে উল্লেখযোগ্য কয়লার মজুত রয়েছে। তবে তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। জনগণের স্বার্থ, পরিবেশ এবং দেশের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অংশীজনদের পরামর্শ গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরো জানান, অতীতে কর্মকর্তাদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হলেও এখন ছয় মাস থেকে দুই বছর মেয়াদি বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্সে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করে দেশের সম্পদে পরিণত করা হবে। কারণ বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলোতেও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। দেশের জনবলকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা দেওয়া গেলে তারাই ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় সম্পদে পরিণত হতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, সরকারের ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নেওয়া সব উদ্যোগে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

এছাড়া সমন্বিত উদ্যোগ, দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান, আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।