শিরোনাম

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আজ বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার শর্তে ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব বিষয়গুলো নিজেরাই পরিচালনার ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে ‘রেগুলেটরি ওভাররিচ’ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে চাই না, তবে আমাদের জারি করা নির্দেশনা ও বিধিবিধান সবাইকে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।’
রাজধানীর একটি হোটেলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর জানান, ব্যাংকিং কমিশন গঠন না করে তিনটি নির্দিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে আর্থিক খাত সংস্কার ও সম্পদ পুনরুদ্ধার দ্রুত সম্পন্ন হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কমিশন গঠন করা হলে তা সময়সাপেক্ষ হতো, রিপোর্ট তৈরি করতে কমপক্ষে ছয় মাস এবং সেটি পর্যালোচনায় আরও তিন মাস সময় লাগত। এতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকত না।
গভর্নর বলেন, ‘আমরা কোনো কমিশন গঠন করব না। আমরা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সরাসরি বাস্তবায়নে যাব।’ তিনি জানান, তিনটি টাস্কফোর্সের কাজের ক্ষেত্র হচ্ছে-ব্যাংকিং খাত সংস্কার, বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জটিলতা তুলে ধরে গভর্নর জানান, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, ব্রিটিশ সরকার, এফবিআই এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)-এর মতো একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলাই চূড়ান্ত লক্ষ্য, যা আর্থিক অপরাধ মোকাবেলায় ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে।
গভর্নর জানান, ইতোমধ্যে ১২-১৩ জন বড় অপরাধী এবং আরও প্রায় ২০০ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা প্রত্যেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি চলমান আইনি ব্যবস্থা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিশেষ করে লন্ডনে সাইফুজ্জামানের সম্পদ পুনরুদ্ধারের মামলার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ইসলামী ব্যাংকও দাবি উত্থাপন করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান বলেন, অর্থনীতি সচল রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করছে। তিনি ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কারখানা সচল রাখাই মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো কারখানা বন্ধ করতে চাই না... কোনো মত, কোনো দল নয়-যদি কারখানা থাকে, সেটি চালু রাখাই উদ্দেশ্য।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অপরিহার্য হওয়ায় এলসি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একইভাবে গাজী গ্রুপ ও বেক্সিমকোকেও সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বেক্সিমকো প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ১৮ বা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু টেক্সটাইল বিভাগটি সমস্যায় রয়েছে, তবে ওষুধ ও শাইনপুকুর সিরামিকসসহ অন্যান্য ইউনিট সচল রয়েছে।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দায় পরিশোধ নিয়মিত করার জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে একটি ‘এক্সিট রোডম্যাপ’ তৈরি করা হয়েছে। যেখানে ৫ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা রয়েছে।
গভর্নর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান প্রশাসনের সময়েই আর্থিক আইন পাস করা জরুরি, নইলে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট সংশোধনীটি ‘ব্যবসাবিরোধী’ অভিযোগে কমিটি ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেন, এই সংশোধনী ছাড়া সম্পদ পুনরুদ্ধার অসম্ভব এবং দ্রুত পাস করার আহ্বান জানান।