বাসস
  ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:১২

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : ড. সালেহউদ্দিন

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ফাইল ছবি

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকিং খাতের সার্বিক সংস্কার অপরিহার্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাত সংক্রান্ত অধিকাংশ বিষয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত, তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ও অপরিহার্য। তিনি স্বীকার করেন যে, গত দেড় দশকে পুঞ্জীভূত দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও সুশাসন সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে এই খাত।

তিনি বলেন, ‘এই সমস্যাগুলো হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি এবং ১৪ বা ১৬ মাসের মধ্যে এগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, নিয়মকানুন মানার সংস্কৃতির অবনতি এবং বিবেচনাধীন ক্ষমতার অপব্যবহার খাতটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এই দুর্বলতাগুলো সংশোধনের জন্য হঠাৎ বা বলপ্রয়োগমূলক পদক্ষেপ নয়, বরং সময়, সুপরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশের ভেতরে সমালোচনা থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মোটামুটি ইতিবাচক রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী ও বৈশ্বিক অংশীজনরা সাধারণত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ব্যবস্থাপনা যোগ্য বলে মনে করেন। যদিও তারা ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কারকে কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে দেখেন।

সাম্প্রতিক আইনগত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে আর্থিক খাতের আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি জানান, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট এবং হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অ্যাক্ট সংশোধন পাস হয়েছে এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন জোরদার ও আর্থিক আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি এই খাতের ভঙ্গুরতার পেছনে দুর্বল প্রুডেনশিয়াল নর্মস, বিধিবিধান অমান্য করা, অকার্যকর তদারকি এবং ব্যাংক মালিকদের অতিরিক্ত প্রভাবকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো গ্রহণযোগ্য করপোরেট সুশাসনের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়নি, যার ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অডিট ও তদারকির ভূমিকা তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা অডিট কার্যক্রমে অনিয়মের কথা উল্লেখ করেন এবং নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অধিক দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, আর্থিক অনিয়ম রোধ ও জনস্বার্থ সুরক্ষায় সব প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত কার্যকরী ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা প্রয়োজন। তবে এই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের সার্বভৌম কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যাংকিং খাতে দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা কার্যকর তদারকি ও সঠিক নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার কোনো বিকল্প নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।

বর্তমান সময়সীমার মধ্যে সব সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব না হলেও সরকার এমন একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে ভবিষ্যৎ সরকারগুলো নির্বিঘ্নে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আমানতকারীদের সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহায়তায় এ খাতকে শক্তিশালী করা অত্যাবশ্যক।’