বাসস
  ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:২৫

জ্বালানি নিরাপত্তা শিল্পখাতের টেকসই উন্নয়নে অন্যতম অনুষঙ্গ : ডিসিসিআই সভাপতি

আজ রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই মিলনায়তনে ডিসিসিআই এবং সানেম যৌথভাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সক্ষমতা নীতিমালা, টেকসই উন্নয়নের পথ-নির্দেশনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত। ছবি: বাসস

ঢাকা, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ আজ বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা শিল্পখাতের টেকসই উন্নয়নে অন্যতম অনুষঙ্গ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

যা উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। দেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং টেকসই জ্বালানি কাঠামো গঠন ও অপচয় রোধের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন তাসকীন আহমেদ।

শিল্পখাতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা কেবল নীতিগত অগ্রাধিকারই নয়, বরং টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

আজ রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই মিলনায়তনে ডিসিসিআই এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) যৌথভাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সক্ষমতা নীতিমালা, টেকসই উন্নয়নের পথ-নির্দেশনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ২০৩০ সালের পর দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি বলা হলেও অফশোর-অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে তেমন উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি, তাই আমরা নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাস ব্যবহার করতে পারছি না, আমাদেরকে আমদানি নির্ভর গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সরকার ক্রমাগত ভর্তুকি দিচ্ছে, কারণ এর সাঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জ্বালানি খাতে বর্তমানে দক্ষতার হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে, এ দক্ষতা আরো বাড়ানো সম্ভব হলে বিদ্যুৎ ঘাটতি হ্রাস পাবে। এছাড়াও, দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিলে এ অবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে বলে তিনি মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মাস্টারপ্ল্যান থাকলেও সহায়ক নীতিমালার অনুপস্থিতির বিষয়টি শিল্পখাতকে বেশ ভুগাচ্ছে।

তিনি জানান, ঢাকা চেম্বার ও সানেম যৌথভাবে পরিচালিত ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল ও বাণিজ্যিক খাতের শিল্প উদ্যোক্তা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে জ্বালানি দক্ষতা বিষয়ে সচেতনতা, জ্বালানি নিরীক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয়, অর্থায়ন ও প্রণোদনা, গ্রিড আধুনিকায়ন, বাস্তবায়ন ও যোগাযোগ প্রভৃতি বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

অংশগ্রহণকারীরা এনার্জি অডিট, লজিস্টিক সেবা সম্প্রসারণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়ে বেশকিছু সুপারিশ প্রদান করেন। এছাড়াও কাঠামোগত স্ট্র্যাটেজি, সরবরাহগত স্ট্র্যাটেজি এবং পলিসি ও রেগুলেটরি স্ট্র্যাটেজি এখাতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি)-এর সদস্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান ড. এম. রেজওয়ান খান, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ডিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক মনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সিমেন্ট মেনুফ্যাকচারারস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি এ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা, বিজিএমইএ সহ-সভাপতি বিদিয়া অমৃত খান এবং ইডকলের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মনিরুল ইসলাম প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

বিইপিআরসির সদস্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তার পরই জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তাই এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতা প্রয়োজন। জ্বালানি উৎপাদনে আমদানির উপর বেশিমাত্রায় নির্ভরশীল হলে ব্যবসায়িক খরচ ক্রমাগত বাড়বে, তাই দেশীয় উৎসের উপর বেশি হারে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান ড. এম. রেজওয়ান খান বলেন, বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন না হলে এখাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এছাড়াও পিক ও অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের দাম পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে।

আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শিল্প-কারখানা পর্যন্ত পৌঁছানোর বিষয়টিকে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ার কারণে প্রায়শই শিল্পখাতে ৫০ শতাংশ পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিষয়টি মোটেও কাম্য নয়। তাই এখাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে অতিদ্রুত নিরসনের উপর তিনি জোরারোপ করেন।

বিসিএমএ’র সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপিজি শিল্পখাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বিএসআরইএ’র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, প্রতিনিয়ত গ্যাস উত্তোলন কমলেও চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং প্রতিবছর দেশে জ্বালানি চাহিদা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি বিষয়ক ভালো নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন অবস্থা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৩০০টি এলপিজি অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন রয়েছে। যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে প্রায় ৭০০-৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যার জন্য একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের বেশকিছু সরকারি সংস্থা থেকে লাইসেন্স নিতে গিয়ে হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এর নিরসনে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

বিজিএমইএ সহ-সভাপতি বিদিয়া অমৃত খান বলেন, আমাদের জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের অবদান মাত্র ৪ শতাংশ, যদিও বৈশ্বিক ক্রেতারা বিষয়টিতে বেশ প্রাধান্য দিচ্ছেন, এক্ষেত্রে নীতিসহায়তার বেশ অভাব রয়েছে। তবে, ভবন স্থাপনে গ্রিন ফান্ড থাকলেও বিশেষকরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সেটার অনুপস্থিত রয়েছে এবং এছাড়াও জ্বালানি খাতে অর্থায়ন অত্যন্ত কষ্টকর বিষয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ইডকলের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মনিরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাতের বিদ্যমান নীতিমালাসমূহের কার্যকর বাস্তবায়নে গ্যাপ রয়েছে, যা শিল্পখাতের সমস্যা কে ক্রমশ প্রকট করছে। এখাতে অর্থায়ন নিশ্চিতকল্পে গ্রিন বন্ড প্রবর্তনের উপর তিনি জোরারোপ করেন।

মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী, সাবেক পরিচালক এম বশিরউল্ল্যাহ ভূইয়্যা এবং সদস্য এম এস সিদ্দিকী অংশগ্রহণ করেন।

ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এবং সরকারি-বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ এসময় উপস্থিত ছিলেন।