বাসস
  ০৯ মে ২০২৬, ১১:১৭
আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ১৪:১৬

লালকুঠির সংস্কার শেষ পর্যায়ে, শিগগিরই উদ্বোধন 

পুরান ঢাকার লালকুঠি। ছবি : বাসস

॥ মাহামুদুর রহমান নাযীদ ॥

ঢাকা, ৯ মে, ২০২৬ (বাসস) : মোগল ও ব্রিটিশ আমলের ১৫২ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক লালকুঠির সংস্কার কাজ প্রায় শেষ। শিগগিরই এটি উদ্বোধন করা হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ও লালকুঠি সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক রাজীব খাদেম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে জানান, ২০২৩ সালে লাল ইটের দৃষ্টিনন্দন ভবনটির সংস্কার কাজ শুরু হয়। প্রায় তিন বছর পর এর মূল কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে লালচে ইটের নির্মাণশৈলী ও পুরোনো দিনের ছাপ ধরে রাখতে কিছু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর একসময় ভবনটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ব্রিটিশ আমলের কিছু আসবাবপত্র ও বই অবহেলায় পড়ে ছিল। পরে ডিএসসিসি ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

রাজীব খাদেম বলেন, নানা কারণে লালকুঠি ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি স্থাপনা। সংস্কারের আগে ভবনটি ছিল জরাজীর্ণ। ভেতরের আসবাবপত্রও ছিল ভাঙাচোরা অবস্থায়। ভবনের মূল কাঠামো ও ঐতিহ্য অক্ষুণœ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কাজে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে অভিজ্ঞ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। দেয়াল ফাঙ্গাসমুক্ত রাখতে বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় দেড়শ থেকে ২০০ বছর আগের রূপে ভবনটি সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, লালকুঠিতে ব্রিটিশ আমলের কিছু দুর্লভ বই সংরক্ষিত ছিল। জনসন হলের ওই বইগুলো নিয়ে আবারও লাইব্রেরি চালু ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, ভবনটির ইতিহাসসমৃদ্ধ তথ্য সাইনবোর্ড ও অন্যান্য মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজও চলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের লালকুঠি ঘাটের বিপরীতে ফরাশগঞ্জ ও শ্যামবাজার সংযোগস্থলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক লালকুঠি। সংস্কারের মাধ্যমে ভবনটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ভবনের সামনে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন কৃত্রিম ফোয়ারা দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে।

ছবি : বাসস

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ বাসস’কে জানান, ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ১৮৭৪ সালে ঢাকা সফরে এলে তাঁর স্মরণে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ১৮৮০ সালের ২৫ মে এটি উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গভর্নর জেনারেলের সম্মানে ভবনটির নাম দেন ‘নর্থব্রুক হল’। সে সময় পদস্থ কর্মকর্তা ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সভা এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এখানে অনুষ্ঠিত হতো।

তিনি বলেন, মূল ভবনের পেছনে একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। ১৮৮২ সালে ভবনটি টাউন হল থেকে পাঠাগারে রূপান্তর করা হয় এবং ‘জনসন হল’ নামে একটি ক্লাবঘর সংযুক্ত করা হয়। অল্পসংখ্যক বই নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যে পাঠাগারের বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৮৮৭ সালে এ পাঠাগারের জন্য বিলেত থেকে বই আনা হয়েছিল।

ড. নাছির আহমাদ আরও জানান, ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি ও পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং মানপত্র পাঠ করা হয়। পাকিস্তান আমলে নর্থব্রুক হল তার ঐতিহ্য হারাতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঠাগারের অধিকাংশ বই নষ্ট হয়ে যায়।

ছবি : বাসস

ঢাকার রামপুরা থেকে ঘুরতে আসা জান্নাতুল আদনিন বাসস’কে জানান, ঈদের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্লগে লালকুঠির ছবি দেখে বান্ধবীদের নিয়ে এখানে এসেছেন। বাস্তবে জায়গাটি ছবির চেয়েও সুন্দর। তবে যানজট কম থাকলে অভিজ্ঞতা আরও ভালো হতো।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান সজিব বলেন, এখানে এসে ছবি তুলতে খুব ভালো লাগে। ভবনের প্রতিটি কোণ আলাদাভাবে সাজানো মনে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এটি দারুণ একটি জায়গা। তবে ভবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ থাকলে আরও ভালো হতো।