শিরোনাম

॥ আব্বাছ হোসেন ॥
লক্ষ্মীপুর, ৩০ মে, ২০২৬ (বাসস) : লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই তিন জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হয়ে বিলিয়েছে সৌন্দর্য। জেলার ৫টি উপজেলায় ভাল মানের কোনো বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় ঈদের সময় মেঘনা নদীর পাড় যেন এক ‘মিনি কক্সবাজার’-এ পরিনত হয়েছে।
অপরদিকে অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট,সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডার এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী। সরকারি ছুটির দিন ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ী, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদেও উপচেপড়া ভীড় লক্ষ করা গেছে।
রায়পুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোনো বিনোদন কেন্দ্র। ভুমি সংক্রান্ত জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশু পার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে। গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেঘনা নদীর পাড়ে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ও আলতাফ মাষ্টার ঘাট। সদর উপজেলা পরিষদ থেকে বরিশালের ভোলা নৌপথে মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ১২ কিলোমিটার এবং রামগতি উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে মাত্র একশ’ গজ দূরেই নদীর পাড় দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি।
অন্যদিকে রামগতি উপজেলা আলেকজেন্ডার এলাকা মেঘনার ভাঙনরোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদন কেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি। পিন-পতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদু শব্দ যেন মন জুড়িয়ে দেয় আগত দর্শনার্থীদের।
বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিন থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ-সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।
মেঘনা উপকুলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণ চাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকা ভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালু চরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি-সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকুরীজিবী হেলাল আহম্মেদ। তারা বলেন, ‘জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে। এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।’
খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ ও কলেজ ছাত্রী বলেন, ‘স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্র সৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে জেলেদের ইলিশ ধরার দৃশ্য দেখছি। খুবই ভালো লাগছে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।’
ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বাসস’কে বলেন, ‘জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।’
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সজিব হোসেন বাসস’কে জানান, ভয়াবহ ভাঙনে যখন রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং রামগতির আলেকজান্ডার শহর হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার।’
তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন, ‘সবাই মিলে ট্রলারে ঘুরেছি, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট বা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীও ছিল অতিরিক্ত। কিছুটা ভয় কাজ করছিল।’ গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যায় করে চমৎকার পরিবেশে অসাধারণ পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।
এ বিষয়ে ট্রলার চালক কিরন মাজি বলেন, ‘১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার-ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।’
মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বাসস’কে বলেন, ‘চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস সব একসঙ্গে মিলিয়ে রায়পুর-রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক কক্সবাজার।