শিরোনাম

/ মনসুর আহম্মেদ /
রাঙ্গামাটি,২৯ মে, ২০২৬ (বাসস) : ঈদুল আযহা উপলক্ষে ৭ দিনের টানা ছুটিতে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড়ী কন্যা রাঙ্গামাটিতে।
ঈদের টানা ছুটিতে রাঙ্গামাটি জেলায় পর্যটকদের আগমন ঘিরে জেলা শহর, সাজেক ও কাপ্তাই এই তিন পর্যটন কেন্দ্রে ব্যাস্ততা বেড়েছে ব্যবসায়ীদের।
এখানকার হোটেল, মোটেল, রিসোর্টসহ পর্যটনের বিভিন্ন স্পটগুলোর গেস্ট হাউসগুলোও প্রায় শতভাগই বুকিং হয়ে গেছে বলে বাসস’কে নিশ্চিত করেছেন কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে পাহাড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বরণেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে পাহাড়ী কন্যা রাঙ্গামাটি।
রাঙ্গামাটি পর্যটন ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক অলোক বিকাশ চাকমা বাসস’কে জানান, ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের বরণের জন্য আমরা এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।
তিনি জানান, পর্যটকরা অনলাইন বা অফলাইনে আমাদের হলিডে কমপ্লেক্সে প্রায় ৭০-৮৫ শতাংস রুম বুকিং করেছেন। এবার লম্বা ছুটিতে পর্যটকের ঢল বেশি নামবে বলে আমরা আশা করছি। আর পর্যটকদের সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য দিতে আমরা অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নত করেছি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সবুজ-শ্যামল পাহাড়, হ্রদের নীল জলরাশি প্রকৃতির এমন মোহনীয় রূপের টানে প্রতিবছর রাঙ্গামাটিতে ভিড় জমায় ভ্রমন পিপাসু পর্যটকরা। আর টানা ছুটিতে সেই চাপ বেড়ে যায় বহুগুণ।
লম্বা ছুটিতে ভ্রমণ পিপাসুরা যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তি দূর করতে হ্রদ আর সবুজ পাহাড়ে ছুটে আসেন। জেলার সাজেক ভ্যালী,সিম্বল আব রাঙ্গামাটি খ্যাত ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই হ্রদ, পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক ও সুবলং ঝরনা, রাঙাদ্বীপ, লেকভিউ আইল্যান্ড, কাপ্তাই পট হাউসসহ মনোমুগ্ধকর সব পর্যটন স্পটগুলো মুখরিত হয়ে উঠে পর্যটদের উপস্থিতিতে।
জেলা শহরের পাশাপাশি প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে পাহাড়ী কন্যা রাঙ্গামাটি জেলার সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে পর্যটন খ্যাত সাজেকে ভ্যালীতে।
পর্যটকদের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে পাহাড় আর মেঘের মিতালী সাজেক। আর সাজেকে পর্যটকদের বরণে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রিসোর্ট অ্যান্ড কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বাসস’কে জানান, এবার ঈদের আগে থেকেই সাজেকের রিসোর্ট,কটেজের বেশিরভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে। আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন সব রুম বুকিং রয়েছে। তাছাড়া ঈদের পরের দিন থেকে পরবর্তী প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সাজেকের রিসোর্টের রুম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং রয়েছে।
রাঙ্গামাটির মিনি মালয়েশিয়া খ্যাত রাঙাদ্বীপ রিসোর্টের পরিচালক অলকব্রত চাকমা বাসস’কে জানান,ঈদের লম্বা ছুটিতে আমাদের রিসোর্টের সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। তিনি জানান, প্রায় ২৫টি থ্রি স্টার মানের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের এই রিসোর্টে রয়েছে স্পেশাল ক্যাসল বিল্ডিং, একসাথে দেড়শ’ জনের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউর রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স হল, চেয়ার ম্যাসাজ, স্পোর্টস জোন, কায়াকিং, ছোটদের জন্য এমিউজমেন্ট পার্ক, জিম, বোটিং সুবিধাসহ নানা ইভেন্ট। রয়েছে পুরুষ,মহিলা-শিশুদের জন্য আলাদা আলাদা সুইমিং পুল।
রেস্টুরেন্টে বাংলা, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, থাই ঐতিহ্যবাহী খাবারসহ সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রাঙ্গামাটির পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতু। এরইমধ্যে সেতুকে আরও আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রঙের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যারা কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণ করবেন, তাদের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন ট্যুরিস্ট বোট ব্যবসায়ীরা।
রাঙ্গামাটি পর্যটন নৌযান ঘাটের ইজারাদার মো. ফখরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন,পর্যটক বরণে আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ। বোটগুলো সংস্কার, রঙ করাসহ সব কাজ শেষ। আমরা এখন পর্যটকের জন্য অপেক্ষা করছি।
ঈদের দিন স্থানীয়রাসহ কিছু পর্যটক আসলেও আজ থেকে এখানে পর্যটকের আগমন বাড়বে।
জেলায় আগত পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব উদ্দিন বাসস’কে জানান, পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
কোনো পর্যটক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে হেল্প ডেস্ক।
পর্যটকরা যাতে নিরাপদে জেলার সকল স্পটে ঘুরে বেড়াতে পারেন তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে। এবারের ঈদের ছুটিতে পর্যটকরা নিরাপদে সকলস্থানে ভ্রমণ করতে পারবেন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সেই পরিকল্পনা স্বার্থক এবং আনন্দময় করতে সকল প্রস্তুতি এরই মধ্যে শেষ করেছেন রাঙ্গামাটির পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের ধারণা, টানা ছুটিতে পর্যটকের আগমন বাড়বে। এতে তাদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
রাঙ্গামাটি শহরে ৫৬টি আবাসিক হোটেল, ১৭টি রিসোর্ট ও সাজেকে ১১৬টি হোটেল রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁ আছে ১৪টির বেশি। সবগুলোতেই পর্যটকদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে রাঙ্গামাটি শহরে পর্যটন ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই হ্রদে নীল জলরাশিতে নৌভ্রমণ পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক, সুবলং ঝর্ণা এলাকা, আসামবস্তি কাপ্তাই সড়ক, সাজেক ও কাপ্তাইয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন প্রকৃতি প্রেমীরা।
বছরে কয়েক লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। সাধারণত ছুটির দিনগুলোতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার পর্যটকের উপস্থিতি থাকে রাঙ্গামাটির তিন পর্যটন কেন্দ্রে। আবার বিশেষ দিনগুলোতে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ থেকে ৭০ হাজারে।
পাহাড়ের উচু-নিচু আকাঁবাকা রাস্তা, হ্রদ-ঝরনার সমন্বয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এই জেলা পর্যটকের পদচারণায় প্রায় সব ঋতুতেই মুখরিত থাকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম (৭২৫ বর্গকিলোামিটার আয়তনের) মিঠা পানির কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদের অকৃত্রিম বিশালতার সমন্বয়ে গঠিত এই জেলা।
তাই প্রতিবছর ভ্রমন পিপাসু মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের আশায় ছুটে আসেন। শীতকালে এই সংখ্যা দুই-তিনগুণ বেড়ে যায়। প্রকৃতি এখানে যেন তার সব রূপ ও সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে।