বাসস
  ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩২

ঐতিহ্যের সাক্ষী আড়াইশ’ বছরের পুরোনো চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদ

ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ। ছবি: বাসস

বিপুল আশরাফ

চুয়াডাঙ্গা, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছে এক গর্বের নাম। প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি স্থাপিত হয় ১২০৮ হিজরী, আনুমানিক ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।

মসজিদের মুসল্লীদের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মসজিদটি এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আলম পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও মসজিদটি তার ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ১৭৮৬ সালে কুসুমবিবি নামের একজন মহিলা তার নিজস্ব ৭৩ শতক জমির উপর নিজস্ব অর্থায়নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের মধ্যে এটি ছিল সর্বপ্রথম মসজিদ। এই মসজিদ থেকেই চুয়াডাঙ্গায় প্রথম আযানের সুর বেজে উঠেছিল। বর্তমানে মসজিদটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কিছু কিছু অংশে সংস্কারের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মসজিদের নাম অনুসারে মহল্লাটির নামকরন হয়েছে মসজিদ পাড়া। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র একাডেমী মোড় সংলগ্নস্থানে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ নির্মিত হয়। শুরুতে মসজিদটির ভিতরে ২টি কাতার ও বারান্দায় ১টি কাতারে নামাজ আদায় করা যেত। সময়ের পরিবর্তনে এটি বর্ধিত করা হয়। সেই সময় ৭০ জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারত।

১৪৩৫ হিজরী ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে মসজিদটি সংস্কার কাজ করা হয়। সংস্কারের মাধ্যমে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের জায়গা সম্প্রসারণ এবং নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। ফলে বর্তমানে এটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি বৃহৎ জামে মসজিদ হিসেবে মুসল্লিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বড় মসজিদ বা মিনার মসজিদ নামেই এই মসজিদটি পরিচিতি রয়েছে। এর সুউচ্চ মিনার অনেক দুর থেকে দেখা যায়। বর্তমানে মসজিদের মিনারের তৃতীয় তলার বেলকুনির অংশ ভেঙ্গে গেছে। মসজিদের মিনারটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা। মসজিদের পাশে রয়েছে একটি কবরস্থান। এই বড় মসজিদে রেলপাড়া, মসজিদ পাড়া, একাডেমি মোড়, জোয়াদ্দার পাড়া, বাগান পাড়া, মাঝের পাড়া, মল্লিক পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মুসল্লীরা নামাজ পড়তে আসে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ জুম্মার নামাজে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে এখানে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মিলাদ-মাহফিল ও কোরআন তিলাওয়াতের আসরেও মসজিদ প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে।

মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইবরুল হাসান জোয়ার্দ্দার বাসস’কে বলেন, চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদের ইতিহাসে কুসুম বিবির নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এই মসজিদের জমির মূল মালিক ছিলেন পরোপকারী ও ধর্মপ্রাণ নারী কুসুম বিবি। তিনি ৭৩ শতক জমি আল্লাহর ঘর নির্মাণের জন্য দান করেন। 

এলাকাবাসীর মুখে মুখে প্রচলিত আছে, কুসুম বিবি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। লোককথা অনুযায়ী, নিজের বাড়ি নির্মাণের সময় তিনি মাটির নিচে পাঁচ থেকে ছয় কলসি মোহর খুঁজে পান। বিপুল সম্পদ পেয়ে তিনি ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে না গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এই মোহর কী কাজে ব্যয় করা যায়। তখন এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষরা তাঁকে পরামর্শ দেন, এই অর্থ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে তা হবে সদকায়ে জারিয়া, যার সওয়াব চিরকাল প্রবাহিত হবে। 

সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করে কুসুম বিবি নিজের অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

শোনা যায়, সে সময় নির্মাণকাজে ডিমের কুসুম ও সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করে মসজিদের ভিত্তি ও দেয়াল তৈরি করা হয়, যা সেই যুগের নির্মাণশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ধর্মীয় অনুরাগের ফলস্বরূপ নির্মিত হয় চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ। প্রথম দিকে এই মসজিদে একসঙ্গে ৩ কাতার বন্দি হয়ে প্রায় ৭০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। সময়ের পরিবর্তন ও মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে মসজিদটি পুনরায় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। আধুনিকায়নের মাধ্যমে বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৭শ’ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ জামির হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি নির্মিত হয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি এলাকাবাসীর ইবাদত বন্দেগি ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কুসুম বিবি নামে এক মহীয়সী ও ধর্মপ্রাণ নারী আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই মসজিদের জন্য জমি দান করেছিলেন। বর্তমানে মসজিদের নামে মোট ৭৩ শতক জমি রয়েছে। আমাদের জানা মতে, বর্তমান সভাপতির পূর্বপুরুষরাই ছিলেন এই মসজিদের প্রধান দাতা ও পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের অবদান ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত টিকে আছে এবং ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালে মুসল্লি, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মসজিদটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। সে সময় মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের স্থান সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে এখনও কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যেমন মিনারের উন্নয়ন, অজুখানার আধুনিকায়ন ও সীমানা প্রাচীরের সংস্কার। ধীরে ধীরে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় অবশিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভবিষ্যতে মসজিদটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।