বাসস
  ০৬ জুন ২০২৬, ১৭:১৪

ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ প্রত্ননগরী মুন্সীগঞ্জে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

ছবি : বাসস

 মো.মঞ্জুর মোর্শেদ

মুন্সীগঞ্জ, ৬ জুন, ২০২৬ (বাসস) : বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদ প্রত্ননগরী মুন্সীগঞ্জ। পদ্মা মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছমতি নদীর দ্বীপ দেশ মুন্সীগঞ্জ। এ জেলায় রয়েছে হাজারো বছরের গৌরবোজ্জল ইতিহাস। এখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব  নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয়ে মুন্সীগঞ্জে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। 

সঠিক পরিকল্পনা আর প্রয়োজনীয় উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জকে পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাকৃতিক লিলাভূমি মুন্সীগঞ্জে একদিকে যেমন রয়েছে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মের পুরাকীর্তি। তেমনি এ অঞ্চলের মাটি জড়িয়ে আছে পাল, সেন ও মোগল আমলের স্থাপত্য শৈলীর সঙ্গে।

প্রত্ননগরী মুন্সীগঞ্জে যেমন রয়েছে প্রাচীন যুগের সমৃদ্ধ শাসন ও বাণিজ্যের চিহ্ন, তেমনি রয়েছে কীর্তিমানদের কীর্র্তি ও স্মৃতি চিহ্ন। ওইসব কীর্তিমানরা হলেন, বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস, সরোজিনী নাইরু, কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায়, শীর্ষন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব বসু, কৌতুক শিল্পী ভানু বন্দোপাধ্যায়, চলচিত্র নির্মাতা আব্দুল জব্বার খাঁন, পদার্থ ও অংক শাস্ত্রবিদ মেঘনাথ সাহা, শিক্ষাবিদ আশুতোষ গাঙ্গুলী, ড. হুমায়ুন আজাদ, সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলী এবং চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাসের মতো কীর্তিমানের স্মৃতি বিজরিত চিহ্ন বহন করছে জেলার ৬ টি উপজেলা।

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে অনন্য কীর্তিচিহ্নগুলো এখনো জেলার বিভিন্ন স্থানে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

মোগল স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন বাংলার সুবেদার ও সেনাপতি মীর জুমলার সময়কালে মুন্সীগঞ্জ শহরে নির্মিত ইদ্রাকপুর কেল্লা, সদর উপজেলার রামপালে রাজা বরøাল সেনের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, রাজা বল্লার সেনের হাতে শাহাদাৎ বরণকারী শহীদ বাবা আদম মসজিদ, সদর উপজেলার বজ্রযোগিনীতে বৌদ্ধ পন্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করে স্মৃতিবিজরিত পন্ডিত ভিটা, টংগিবাড়ীতে সোনারংয়ের জোড়া মঠ, রামপালে রাজা বল্লাল সেনের দিঘী, রাজা হরিশ চন্দ্রের দিঘী, রামপালে রঘুরামপুরে বৌদ্ধ বিহার, টংগিবাড়ীতে নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির, শ্রীনগরে ভারতীয় উপমহাদেশের সুউচ্চ শ্যামসিদ্দির মঠসহ সিরাজদিখানে শেখরনগরে ৫০০ বছরের পুরানো কালি মন্দির।

এছাড়াও সুলতানি আমলের টেংগর শাহী মসজিদ, মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিমে সুলতানি আমলের বাণিজ্যিক নগরী নগরকসবা, সদর উপজেলার পানাম বলোকায় গাইবি ব্রীজ নামে পরিচিত পুলঘাটা ইটের পুল এবং টংগিবাড়ীতে মোগল আমলে নির্মিত আব্দুল্লাহপুরের সমাজ মসজিদ কীর্তির স্বাক্ষ্যর আর গৌরবচিহ্ন নিয়ে পুরাকীর্তি হিসেবে দাড়িয়ে আছে। শ্রীনগর-সিরাজদিখান উপজেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত আড়িয়ল বিলের মনোরম পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধকরে। বর্ষা মৌসুমে শত শত ভ্রমনপিপাসু প্রেমিক আড়িয়র বিলের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসেন।

মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম ইরাদত বাসস’কে বলেন, মুন্সীগঞ্জ ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। দেশের অন্যতম প্রাচীন এই জনপদের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে শুধু পর্যটন জেলা নয়, দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে পরিণত করা যায়। পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধি করতে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে। সে মহা পরিকল্পনায় মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষাবিধ ও সাংবাদিক মো. মাহবুবুর রহমান বাসসকে বলেন, জেলার এই প্রত্নতত্ত্ব স্থাপনা সর্ম্পকে বর্তমান প্রজন্ম কিছুই জানে না। দেশি বিদেশি পর্যটকরা এখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা ও পুরাকীর্তির অবস্থান জানে না। তাই পর্যটনের সম্ভাবনাময় পুরাকীর্তিগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধন করা একান্ত প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত তথ্যফলক, বিশ্রামাগারর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে নান্দনিকভাবে দেশবাসীর কাছে উপস্থাপন করতে পারলে দেশি বিদেশি পর্যটক এখানে আসবেন। পর্যটন প্যাকেজ চালু করতে পারলে পর্যটকদের মুন্সীগঞ্জে আসার আগ্রহ বাড়বে।

মুন্সীগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এ্যাড. জাকারিয়া মোল্লা বলেন, পদ্মা সেতু করার সময় পদ্মা সেতু ঘিরে শিমুলিয়ায় বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলেও তা আর হয়নি। উদ্যোক্তার অভাবে এখানে ভালো মানের বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠছে না। 

তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী আড়িয়র বিল এবং পদ্মা সেতুর মাওয়ায় পরিকল্পিত বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুললে মুন্সীগঞ্জে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। জেলার প্রত্নতাত্বিক ও দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৫০ টি। মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে তা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।

মাওয়ায় শিমুলিয়া ঘাট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, এ এলাকায় বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুললে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে এসে সারাদিন মুন্সীগঞ্জের প্রায় ৫০ টি প্রত্নতাত্বিক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে আড়িয়র বিল ও মাওয়ার পদ্মা সেতু এলাকার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। 

তারা আরও বলেন, মুন্সীগঞ্জের প্রত্নতত্ব নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনে এসে ভোজন পিপাসুগণ রামপালের সাগর করা, সিরাজদিখানের ঐতিহাসিক পাতক্ষিরা আর মুন্সীগঞ্জের রসগোল্লা ও সানার আমিত্তির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বাসস’কে বলেন, মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০ কোটি টাকার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি ) তৈরি করে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। 

বর্তমানে সেটি পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য সেখানে রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য দেশ বিদেশে পর্যটকদের নিকট পৌছে দেয়া যাবে। মুন্সীগঞ্জ একটি পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।