বাসস
  ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩৬

পর্যটকদের পদচারণায় মুখর দিনাজপুরের রামসাগর

দিনাজপুর সদর উপজেলার তাজপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক রামসাগর দিঘি। ছবি : বাসস

\ রোস্তম আলী মন্ডল \

দিনাজপুর, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর সদর উপজেলার তাজপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক রামসাগর দিঘি। সারাবছর পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে এটি। তবে শীতকালে দেশি-বিদেশি পর্যটক এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষা সফরে আসা শিক্ষার্থীদের আগমনে এখানে উৎসবের আমেজ বেড়ে যায়।

রামসাগর পর্যটক কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত বন বিভাগের কর্মকর্তা হাসান ফিরোজ এ তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, এখন শীতের মৌসুমের মাঝামাঝি সময়। হেমন্তের শুরু থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত রামসাগর এলাকায় পর্যটক ও শিক্ষা সফরে আগত শিক্ষার্থীদের আগমন বেশি ঘটে। প্রতিদিন আনন্দঘন উৎসব পরিবেশে আগত পর্যটকদের পদচারণায় রামসাগর এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।

হাসান ফিরোজ বলেন, রামসাগরের গেস্ট হাউজে পর্যটকদের থাকার জন্য ৮টি রুম রয়েছে। কিন্তু শীতে পর্যটকদের আগমন বেড়ে যাওয়ায় গেস্ট হাউজের কোনো রুম খালি থাকে না। শীতকালে আগাম মোবাইলে গেস্ট হাউজের রুমগুলো বুকিং দিয়ে রাখছেন পর্যটকেরা। বন বিভাগের ১৫ জন এসব দায়িত্বে রয়েছেন।

ভিআইপি পর্যটকেরা এখানে এসে দেশের সর্ববৃহৎ বড়দিঘি ও মনোমুগ্ধকর জলরাশি নান্দনিক পরিবেশে উপভোগ করতে গেস্ট হাউসে কয়েকদিন অবস্থান করেন। পর্যটকরা  তৃপ্তি সহকারে রামসাগর এলাকায় বিচরণ করে আবার ফিরে যান। পর্যটকদের অবস্থানকালীন তাদের সেবার মান ঠিক রাখা হয়। ফলে এখানে হেমন্ত ও কার্তিকের শুরু থেকে বসন্তে ফাগুন-চৈত্র মাস পর্যন্ত পর্যটকদের আগমন বেশি থাকে।

পিকনিকের মৌসুম শুরু হওয়ায় এখন প্রায় প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি বাস ভর্তি লোকজন বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে পিকনিক করতে আসছেন। পিকনিকে আসা লোকজন এখানে আনন্দ সহকারে রামসাগরে গোসল করে তৃপ্তি নেন। তারা অনেকেই বলেন, রামসাগরে গোসল করাটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।

রামসাগরের বিশাল জলরাশির পাশাপাশি, এখানে রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। এতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি হরিণ রয়েছে। পর্যটক ও পিকনিকে আসা দর্শনার্থীরা হরিণ দেখে মুগ্ধ হন। চিড়িয়াখানায় হরিণসহ অন্যান্য পশুপাখি রামছাগল, বানর, উট পাখিদের খাবার দিয়ে পর্যটকরা খুশি হন। 

এছাড়া কৃত্রিম পশুপাখি যেমন উট, হরিণ, হাতি, গাধা, বাঘ, সিংহের সঙ্গে ছবি তুলে তারা স্মৃতি সংরক্ষণ করে রাখেন।

রামসাগরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী জয়পুরহাট সদর উপজেলার মশিউর রহমান জানান, তিনি তার স্ত্রী ও পরিবারসহ ৭ জন এখানে ঘুরতে এসেছেন। এখানকার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে তিনি অভিভূত। রামসাগরের জলরাশির পাশে স্থাপন করা হয়েছে দর্শনাথীদের বসার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা। এসব স্থানে বসে রামসাগরের পানির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে আনন্দিত হচ্ছেন তারা।

রামসাগরে ঘুরতে আসা পর্যটক বগুড়া জেলার নয়ন কৃষ্ণ রায় জানান, তারা ৫ জন দুদিন গেস্ট হাউসে থেকে এখানকার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করছেন।

রামসাগর জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জার মো. শহিদুল ইসলাম জানান, পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য একটি নির্ধারিত টাকা দিয়ে টিকিট কেটে রামসাগর জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করতে হয়। আগতরা মনোরম পরিবেশে এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করে তৃপ্তি সহকারে ফিরে যান।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিসহ রামসাগরের আয়তন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার। দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৩১ মিটার ও প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। গভীরতা গড়ে প্রায় ১০ মিটার। পাড়ের উচ্চতা ১৩.৫ মিটার।

তাজপুর গ্রামের প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রামসাগর নিয়ে অনেক ঐতিহ্য ও কল্প কাহিনী রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ (রাজত্বকাল ১৭২২ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ) পলাশীর যুদ্ধের আগে (১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) এ রামসাগর দিঘি খনন করে ছিলেন। তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় রামসাগর। জনশ্রুতি রয়েছে, দিঘিটি খনন করতে তৎকালীন প্রায় ৩০ হাজার  টাকা ব্যয় হয়েছিল। এটি ১৫ হাজার শ্রমিক মিলে খনন করেছিলেন। 

রামসাগর দিনাজপুর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে ১৯৬০ সালে দেয়া হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে এ দিঘিকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে এলাকায় জনশ্রুত রয়েছে, ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে এক খরা দেখা দিলে পানির অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে হাজার হাজার প্রজা। এ সময় দয়ালু রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নাদেশ পেয়ে একটি পুকুর খনন করেন। মাত্র ১৫ দিনে এর খনন কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই পুকুর থেকে পানি না ওঠায় এক সময় রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন যে, তার একমাত্র ছেলে রামকে দিঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে। স্বপ্নাদিষ্ট রাজা, দিঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। 

তারপর এক ভোরে যুবরাজ রামনাথ সাদা পোশাকাচ্ছাদিত হয়ে হাতির পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন সেই দিঘির দিকে। এর পাড়ে পৌঁছে যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দিঘির তলা থেকে অঝোর ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে পানিতে ভরে গেল বিশাল দিঘি।

রামসাগর দেশের জাতীয় সম্পদ। এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সামগ্রিক নির্মাণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী নির্মাণ কাজ আর্থিক বরাদ্দ সাপেক্ষে বাস্তবায়নাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ সম্পদ সংরক্ষণে সরকার তথা সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাহলে ঐতিহ্যবাহী রামসাগর তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে।