শিরোনাম

/ মো. হাফিজুর রহমান /
বরগুনা, ১৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : সুন্দরবন সংলগ্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় উপকূলীয় জেলা বরগুনা। এ জেলার ওপর দিয়ে চারটি খরস্রোতা নদী বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশেছে। বিষখালী, বলেশ্বর, বুড়িশ্বর ও আন্ধার মানিক এ চারটি নদী সাগরে যেখানে মিশেছে, ঠিক সেখানেই বিস্তির্ণ জলমোহনা। বঙ্গোপসাগরের মোহনীয় এ জলমোহনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ছোট স্নিগ্ধ দ্বীপবন। যেখানে হরিণ, বানর, কুমিরসহ রয়েছে শত প্রজাতির পাখ-পাখালি।
অন্যদিকে সুন্দরবনের অভয়াশ্রম যেমন সুপতি, কটকা, শ্মরণখোলা, চান্দেশ্বর, হিরণপয়েন্ট, দুবলারচর ইত্যাদি গহীন অরণ্যগুলো বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা থেকেই তুলনামূলকভাবে অনেক কাছে। যেখানে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ ও কুমিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পশু নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায়।
এছাড়া বরগুনার তালতলী উপজেলা থেকে কুয়াকাটার অবস্থান পটুয়াখালী জেলার তুলনায় অনেক কাছে। কুয়াকাটায় ভ্রমণে যাওয়া দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ সোনাকাটা ইকো পার্ক, টেংড়াগিড়ির বন, শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, নিদ্রারচর, আশারচর। আর এসবই বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলায় অবস্থিত। যেখানে রয়েছে বৈচিত্রময় রাখাইন আদিবাসীর বসবাস।
এদিকে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার লালদিয়ারচর, হরিণঘাটা, সদর উপজেলার গোড়াপদ্মা, মোহনা পর্যটনকেন্দ্র, লীলাবতী, বেতাগী উপজেলার ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহী মসজিদ ও পাখিরচর যে কোন পর্যটককে বিমোহিত করবে।
পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় একটি জেলা বরগুনা। অথচ এ জেলার উন্নয়নে নেই কোন উদ্যোগ, নেই কোন উদ্যোক্তা। সরকারি বেসরকারি কোন পদক্ষেপও ছিলো না কোথাও।
এমনই এক সময়ে শত প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথমবারের মত বরগুনায় প্রকৃতিভিত্তিক সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম এন্ড রিসোর্ট নামে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সাহসী উদ্যোগ নেন বরগুনার লেখক, সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ।
স্থানীয় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে শুরু থেকেই প্রকৃতিভিত্তিক ব্যতিক্রমী এ রিসোর্টটিকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। পাশপাশি এ রিসোর্টটির উন্নয়নে এগিয়ে আসেন স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতবৃন্দ।
বরগুনা শহর হতে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত সুরঞ্জনা ইকো-ট্যুরিজম এন্ড রিসোটর্টি। বরগুনার খাকদোন ও বিষখালী নদীর কোল ঘেষে গড়ে ওঠা এ পর্যটন কেন্দ্রটি সদর উপজেলার ৭ নং ঢলুয়া ইউনিয়নের বড়ইতলা ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকার মনোরম পরিবেশে বেষ্টিত।
গোল পাতা, নলখাগড়া, হোগলা পাতা এবং কাশবন দিয়ে সুরঞ্জনাকে সাজানো হয়েছে। সুরঞ্জনার পাশে কাঠ বাদাম, কদম, ডেউয়া, বৈলামসহ বিলুপ্ত প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ রোপন করে নির্মাণ করা হয়েছে আরেকটি উপবন। লাল, নীল, শাদাসহ হরেক রঙের পদ্ম এবং শাপলা ফুল ও চারিদিকে শিমুল গাছ রোপণ করে তৈরি করা হয়েছে নীল পদ্মের শিমুল পুকুর। আরেকটি পুকুরের চারিধারে বকুল গাছ রোপণ করে নাম দেয়া হয়েছে বকুল পুকুর।
এছাড়া সরকারি হর্টি কালচারের সহযোগিতায় পাখিদের জন্যে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ বৃক্ষ। জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এসব পুকুরে মাছের সাথে আছে মুক্তোর চাষ। প্রজাপতি আর জোনাকীদের জন্যেও তৈরি করা হয়েছে অনুকূল প্রতিবেশ।
সুরঞ্জনায় শুধুমাত্র পাখিদের খাদ্য সংস্থানের জন্য সহস্রাধিক বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ফলজ বৃক্ষের বাগান করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া বাবুই পাখির সন্ধানে সুরঞ্জনায় রোপণ করা হয়েছে শতাধিক তালগাছ ও শতাধিক খেজুর গাছ। এছাড়া নানা প্রজাতির শতাধিক পেঁপে ও কলা গাছও লাগানো হয়েছে শুধুমাত্র পাখির খাবার জন্যে।
সুরঞ্জনায় পিকনিক কিংবা আনন্দ ভ্রমণের জন্যে রয়েছে খোলা মাঠসহ একাধিক নান্দনিক মঞ্চ। যে কোন কর্মশালা, সভা এবং সেমিনারের জন্যে সুরঞ্জনায় রয়েছে আধুনিক মিলনায়তন ও আবাসিক সুবিধা।
সুরঞ্জনায় এসি, নন এসি, কাপল, সিঙ্গেল, ডাবল এবং ফ্যামিলি বেডের ১১টি কটেজ রয়েছে। এছাড়াও যে কোন গ্রুপ ট্যুরের জন্যে রয়েছে স্বল্প খরচে ডরমেটরি সুবিধা।
এ বিষয়ে জেলা পর্যটন উদ্দোক্তা উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও সুরঞ্জনা ইকো-ট্যুরিজম এন্ড রিসোর্ট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংবাদিক সোহেল হাফিজ বলেন, বরগুনায় সাধারণ মানুষের জন্য বিনোদনের জন্য তেমন কোন পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র নেই। উদ্যোক্তার অভাবে এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠেনি। তাই আমি সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম এন্ড রিসোর্ট নামে এ পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেই।
তিনি বলেন, প্রতিদিন দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন। দেশের প্রতিটি জেলায় পাখিদের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে অভয় আশ্রম করা প্রয়োজন।
পর্যটক আবদুল্লাহ আল নাইম বলেন, সুরঞ্জনার চারপাশে যে গাছপালা রয়েছে, তা প্রকৃতির এক অভয়ারণ্য। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে এখানে যেসব পর্যটকরা ঘুরতে আসেন, তারা এই সুন্দর পরিবেশ দেখলে তাদের এমনিতেই ভালো লাগে। এখানে যে ফল গাছগুলো রয়েছে পাখিরা সেগুলো খাচ্ছে। পাখির কিচির মিচির শব্দে পর্যটকরা মুগ্ধ হয়ে যায়।
পর্যটক সালেহ মাহমুদ সুমন বলেন, এখানে এলে প্রকৃতির প্রকৃত রুপকে অবলোকন করা যায়। পাখির শব্দে আলাদা এক অনুভুতি হয় ।
বরগুনা নলি-মনসাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, বরগুনা শহরের খুব কাছে সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম এন্ড রিসোর্টটি অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে। এখানে এলে প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।
বরগুনার পর্যটন উদ্যোক্তা ও পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, প্রকৃতি যেন দুই হাত ভরে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে বরগুনার বুকে। নদী, সাগর, চর আর সবুজের অপার মেলবন্ধনে গড়া এ জনপদ যে কোনো সৌন্দর্যপিয়াসী মানুষকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। লালদিয়া চর, নিদ্রার চর, শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত, হরিণঘাটা, রুহিতার চর প্রতিটি স্থান যেন প্রকৃতির আঁকা জীবন্ত একেকটি ক্যানভাস। নদীর বুকে সূর্যাস্তের রঙ, সাগরের ঢেউয়ের গর্জন আর নির্জন চরাঞ্চলের শান্ত সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়।
তিনি বলেন, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হলে খুব সহজেই দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ও আদর্শ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আজিজ বাসস’কে বলেন, সুরঞ্জনা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং একটা চমৎকার ইকো ট্যুরিজম সেন্টার।
তিনি বলেন, এর বাইরেও সরকারি উদ্যোগে আমরা বন বিভাগ থেকে যদি অনাপত্তি পাওয়া যায়, তাহলে গোড়াপদ্মাকে নিয়ে আরো কাজ করতে চাই। এটিকে সুন্দর একটি পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সমুদ্রের ওখানে যদি গোসল করার জন্য ট্রেইল ও বসার যায়গা তৈরি করে দিতে পারি এবং বন বিভাগের সাথে কাজ করতে পারি তাহলে সব কিছুই করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে আমার বিষদ পরিকল্পনা আছে।