বাসস
  ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৬:০০
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৬:১৬

খুলনায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে দৃষ্টিনন্দন দারুল উলুম জামে মসজিদ

দারুল উলুম জামে মসজিদ, খুলনা । ছবি : বাসস

।। মুহাম্মদ নূরুজ্জামান।।

খুলনা,৩০আগস্ট, ২০২৫(বাসস): অপূর্ব সৌন্দর্যের কারুকার্য খচিত খুলনার দারুল উলুম মসজিদ জামে মসজিদের জৌলুস যেন দিন দিন বাড়ছে। মসজিদ এলাকায় প্রবেশ করতেই চোখ জুড়িয়ে যায় সবার। কৃত্রিম কারুকার্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটায় অপরূপ এক মোহনীয় পরিবেশ বিরাজ করছে এই মসজিদে। 
এই মসজিদে সহজেই দেখা মিলবে অর্কিড, বনসাই, সাইকাস পাইনাসসহ নানা ধরনের শোভা বর্ধনকারী উদ্ভিদের। এ কারণে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের সৌন্দর্য অবলোকন করতে।

খুলনার ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম মাদ্রাসা জামে মসজিদ। কৃত্রিম কারুকার্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিশেল ঘটেছে মসজিদটিতে। সাদা টাইলসে মোড়ানো নান্দনিক মিনার। আছে দৃষ্টিনন্দন শাহী গেট। মিনার থেকে প্রধান ফটক পর্যন্ত কারুকার্য যেন একটির থেকে আরেকটির সৌন্দর্য বেশি। রয়েছে সুসজ্জিত বাগান, যেখানে দেখা মিলবে শোভাবর্ধনকারী দেশি-বিদেশি নানা উদ্ভিদের। ভেতরে রয়েছে আলো ঝলমলে লাইটিং ব্যবস্থা। 

কারুকার্য খচিত চমৎকার সৌন্দর্যমণ্ডিত সাদা রঙের এই মসজিদের আরেক নাম ‘তালাবওয়ালা জামে মসজিদ’। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে বড় বড় ক্যাকটাস গাছ। এই মসজিদে প্রায় দুই হাজার মুসল্লির নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের চারপাশ ঘিরে অনেকগুলো মিনার রয়েছে। তবে সর্ববৃহৎ মিনারটি ‘আব্দুল জব্বার মিনার’ নামে পরিচিত।  

দারুল উলুম মসজিদ খুলনা শহরের সবচেয়ে বড় মিনারবিশিষ্ট। মসজিদটি ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদের মিনারটির উচ্চতা ২২৬ ফুট। এই মসজিদ দেখে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়।

জানা গেছে, ১৯৬৭ সালে খুলনা মহানগরীর মুসলমানপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা’। খুলনা মহানগরীর সাতরাস্তা থেকে দক্ষিণে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই মুসলমানপাড়ার অবস্থান, যেখানে রয়েছে নির্মাণ ঐতিহ্যবাহী তালাবওয়ালা জামে মসজিদ। আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর অনুপ্রেরণায় বিশিষ্ট সমাজসেবক মরহুম আবদুল হাকিম জমাদ্দারের পৃষ্ঠপোষকতায় মাওলানা মুজিবুর রহমান (রহ.) এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মসজিদের নির্মাণকাজ, নির্মাণশৈলী এবং চারপাশের পরিবেশের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে বিখ্যাত। ফলে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে নামাজ পড়তে আসেন।

নজরকাড়া মসজিদে প্রবেশ করতেই চোখ জুড়িয়ে যায় সবার। মসজিদের সৌন্দর্য বাড়াতে চারদিকে স্থাপন করা হয়েছে লাইটপোস্ট। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। এ মসজিদটিতে রয়েছে ২২৬.৫ ফুট উচ্চতার বিশাল মিনার। দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ মিনার এটি। মসজিদ ও মিনারটির পুরোটাই সাদা টাইলস দিয়ে মোড়ানো। সুউচ্চ মিনার ছাড়াও মসজিদটিতে রয়েছে চারটি গম্বুজ। মসজিদের তিন পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ এবং অন্যতম সুন্দর মিনার দেখে মুগ্ধ হন সবাই। মসজিদ অভ্যন্তরে রয়েছে নানা ধরনের উদ্ভিদের সুসজ্জিত বাগান। সেখানে মিলবে অর্কিড, বনসাই, সাইকাস, পাইনাসসহ নানা ধরনের শোভা বর্ধনকারী উদ্ভিদের দেখা। এ ছাড়া চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন জাতের সুপারি ও নারকেল গাছ। নান্দনিক কারুকার্য খচিত অংশগুলো রাতের বর্ণিল আলোকসজ্জায় আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। যা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন লোকজন।  

মসজিদের প্রধান গেটকে বলা হয় ‘তালাবওয়ালা শাহী গেইট’। মসজিদ সংলগ্ন রয়েছে বিশাল মাদরাসা। যার নাম ‘জামিআ ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদরাসা’। মিনার ছাড়াও মসজিদটিতে রয়েছে চারটি গম্বুজ। যেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচবার আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া এখানে রয়েছে আধুনিক শৌচাগার, অজুখানা, গোসলখানা।

মসজিদটির চারপাশে দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে হরিণের চামড়ার ওয়ালমেট। যেখানে খোদাই করে লেখা আছে বিভিন্ন ধরনের কোরআন ও হাদিসের বাণী।

লেখক বেলায়েত হুসাইনের তথ্য মতে, দারুল উলুম খুলনা বিভাগের অন্যতম প্রধান দীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খুলনা মহানগরীর মুসলমান পাড়ায় ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মাদরাসাটি জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম খুলনা নামে প্রসিদ্ধ। । মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম মাওলানা মুশতাক আহমদ। ২০০০ সালে ইসলামী আইন গবেষণা অনুষদ (ইফতা) এবং তাফসির বিভাগ চালু করা হয়। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষা শেখানো হয় এ মাদরাসায়। আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এতিম ও দরিদ্রদের শিক্ষাগ্রহণে বিশেষ সুযোগ আছে।
ঐতিহ্যবাহী এই মাদ্রাসাটির মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মোশতাক আহমদ বলেন, মাদরাসাটিতে বর্তমানে দেড় হাজারের অধিক ছাত্র রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৭০০ ছাত্র আবাসিক। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা মাদরাসা কর্তৃপক্ষই করে থাকেন। কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই মাদরাসাটি পরিচালিত হয়ে আসছে।

খুলনার দারুল উলুম মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক ও মসজিদের খতিব মাওলানা মুশাররফ হুসাইন বলেন, মসজিদে জুমার দিন একতলা, দ্বিতলা, তিনতলা এবং সামনের মাঠও মুসল্লিতে ভরে যায়। এই মসজিদে ২ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রতি শুক্রবার এখানে ঈদের মতো একটা উৎসব হয়। এছাড়া যেকোনো সময় মুসল্লিরা প্রবেশ করতে পারেন। এমনকি মসজিদে রাতেও তালা দিয়ে রাখা হয় না, মানুষ যাতে ভালোভাবে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারে এ জন্য।
মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন বলেন, এই মাদ্রাসা ও মসজিদের খুবই সুনাম রয়েছে। এখানকার ছাত্ররা সারাবিশ্বে রয়েছে। এখানকার লেখাপড়ার মান খুবই ভালো। মসজিদের ভেতরে গাছ-পালা দিয়ে সাজানো হয়েছে, যাতে মুসল্লিরা আগ্রহভরে নামাজ আদায় করতে পারেন। 
স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ যোবায়ের বাসসকে বলেন, মসজিদটি খুলনার ইতিহাসের সাক্ষী। যুগ যুগ ধরে এই মাদ্রাসা ও মসজিদটি ইসলামের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করতে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসেন এই মসজিদে। বিশেষ করে মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসাটি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দীন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এখানে যারা লেখাপড়া করে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা। মাদ্রাসাটি আলেম-ওলামা সৃষ্টিতে অবদান রেখে চলেছে।

আবনায়ে দারুল উলুম খুলনার সদস্য হাফেজ মাওলানা ফয়জুল্লাহ সিদ্দিকী বাসসকে বলেন, তিনি দারুল উলুম মাদরাসার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে গর্ববোধ করেন। কারণ একদিকে এ মাদ্রাসাটি যেমন খুলনাঞ্চলের সর্বোচ্চ দীন  প্রতিষ্ঠান, তেমনি দারুল উলুম জামে মসজিদের সৌন্দর্য্য এবং কারুকার্য সবার নজর কাড়ে। এ মসজিদে নামাজ আদায় করলে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়।