বাসস
  ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৫

ভাওয়াল গড় বাংলার ঐতিহ্য ও লোককথার এক অনন্য সাক্ষ্য

ছবি: বাসস

মুহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

গাজীপুর, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : শাল, গজারির জেলা গাজীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত ভাওয়াল গড় বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোককথার এক অনন্য সাক্ষ্য। 

এক সময় ঘন শালবনে আচ্ছাদিত এই উঁচু ভূমি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং জমিদারি শাসন, রাজকীয় স্থাপত্য, ইশা খাঁ ও বারো ভুঁইয়াদের আন্দোলন,  এবং উপমহাদেশের আলোচিত ভাওয়াল সন্যাসীর বিচারিক ঘটনার জন্যও ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

ভাওয়াল গড় মূলত বর্তমান গাজীপুর জেলা সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও কাপাসিয়া উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ছিল। প্রাকৃতিকভাবে এটি ছিল উঁচু ও দুর্গম অঞ্চল, যা শাসন ও নিরাপত্তার জন্য উপযোগী ছিল। 

ইতিহাসবিদদের মতে, ভাওয়াল জমিদারি ছিল বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ জমিদারি। এখানকার প্রশাসনিক কাঠামো ও স্থাপত্য শৈলী দেখে বোঝা যায়, রাজারা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। 

মধ্যযুগে ভাওয়াল অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরগনা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং মুঘল আমলে এটি রাজস্ব আদায়ের একটি অন্যতম কেন্দ্র ছিল।

১৭শ শতকের শেষভাগে ভাওয়াল জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভাওয়ালের রাজারা ছিলেন প্রভাবশালী জমিদার, যাদের রাজধানী ছিল বর্তমান ভাওয়াল রাজবাড়ি। এই রাজবাড়ি ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণে নির্মিত, যা আজও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। ভাওয়াল রাজাদের স্থাপত্ব নিদর্শনগুলোর মধ্যে মূল রাজবাড়ি ছাড়াও রাজবাড়ির অভ্যন্তরে নির্মিত নাট মন্দির, ভাওয়াল রাজ দীঘি, রাজবাড়ি থেকে অনতিদূরে নির্মিত শ্মশান মঠ মন্দির অন্যতম।

গাজীপুরের সিনিয়র সাংবাদিক রেজাউল বারী বাবুল বাসসকে বলেন, ভাওয়াল পরগনা বর্তমান গাজীপুর জেলা ও আশপাশের কয়েকটি জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। একসময় গাজীরা এই ভাওয়াল গড়ের শাসক ছিলেন। 

ইতিহাসে আমরা দৌলত গাজীর নাম শুনেছি। দৌলত গাজীর কাছ থেকেই পরবর্তীতে বলরামসহ অন্য হিন্দুরাজারা রাজত্ব লাভ করেন।

তিনি বলেন, ভাওয়াল গড়ের প্রশাসনিক কাজ ভাওয়াল রাজবাড়িকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো। জানা গেছে, ১৮৭০-১৮৮০ সালের দিকে ভাওয়াল রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। ভাওয়াল রাজবাড়িতে ৩৬৫টি কক্ষ রয়েছে। সামনে রয়েছে উদ্যান। এর বাহিরে রয়েছে বিশাল রাজবাড়ি মাঠ। মাঠঘেঁষে রয়েছে সরকারি রাণী বিলাশমনি উচ্চ বিদ্যালয়। নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ভাওয়াল রাজবাড়ির পাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল সুবিশাল দীঘি। যেটা রাজ দীঘি নামে পরিচিত।

জেলার সিনিয়র রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, গাজীপুর ইউনিটের সেক্রেটারি এ. এম. আশরাফ হোসেন বাসসকে বলেন, ভাওয়াল পরগনা মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সম্রাট আকবরের আমলে। সে সময় কর প্রথাও চালু হয়েছিল। সম্রাট আকবর কর আদায়ে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছিলেন। ভাওয়াল পরগনা থেকে তখন বিশাল অঙ্কের কর আদায় হতো।

তিনি বলেন, ভাওয়াল পরগনা একসময় গাজীদের শাসনে ছিল। পরবর্তীতে কালী নারায়ণ এটার মালিক হন। তার অধীনে অনেক জায়গা ও সবুজ চত্বর ছিলো। কিন্তু কালের প্রবাহে সেগুলো অনেকটা বেহাত হয়ে যাচ্ছে। যদি সরকার সঠিক পরিকল্পনা নিতে পারে তাহলে ভাওয়াল পরগনার সম্পদগুলো সরকারের কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

ভাওয়াল গড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো ভাওয়াল সন্ন্যাসী রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের মামলা। 

দ্বিতীয় ভাওয়াল রাজা রামেন্দ্র নারায়ণ রায়ের মৃত্যুর বহু বছর পর এই সন্ন্যাসী নিজেকে ভাওয়াল রাজ পরিবারের সদস্য হিসেবে রাজত্ব দাবি করেন। ১৯৩০ সালে ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারি ও নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে তিনি মামলা করেন। যার বিবাদী করা হয়েছিলো রাণী বিভাবতী দেবীসহ অন্যদের। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ব্রিটিশ আমলে এই মামলা ভারতবর্ষের অন্যতম দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর মামলায় পরিণত হয়েছিল।

ভাওয়াল গড় ছিল শাল, গজারি ও কড়ই গাছে ঘেরা বিস্তৃত বনভূমি। বর্তমানে এই বনাঞ্চলের অংশবিশেষ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান হিসেবে সংরক্ষিত। এই বন ঘিরে ডাকাত, সাধু-সন্ন্যাসী ও বীরত্বগাথার নানা লোককথা প্রচলিত রয়েছে, যা ¯’ানীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাওয়াল গড়কে ঘিরে গড়ে ওঠা পালাগান, যাত্রা ও লোককাহিনি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক মূল্যবান ভাণ্ডার।

বর্তমানে ভাওয়াল গড় ও রাজবাড়ি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও সংরক্ষণের অভাবে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন ক্ষতির মুখে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ভাওয়াল গড়কে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে আরও পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।