বাসস
  ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২০:২৯

৭ বছরে গমের উচ্চফলনশীল পাঁচটি জাত উদ্ভাবন করেছে বিডব্লিউএমআরআই

ফাইল ছবি

রেজাউল করিম মানিক

রংপুর, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডব্লিউএমআরআই) দেশে গম ও ভুট্টার চাষ বাড়াতে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলেছে। 

বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় সহনশীল, দেশজুড়ে আবাদযোগ্য এবং ভালো ফলন হবে এরকম উদ্ভাবিত গম ও ভুট্টার নতুন জাত চাষে দেশব্যাপী কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।

বর্তমানে দেশে চাষ হওয়া গমের প্রায় সবকটি জাত বিডব্লিউএমআরআইর উদ্ভাবিত। আর এতে করে দেশের আমদানি-নির্ভরতা ক্রমেই কমছে।

বিডব্লিউএমআরআই জানায়, গত ৭ বছরে তারা গমের উচ্চফলনশীল পাঁচটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতগুলোর নামকরণ করা হয়েছে বিডব্লিউএমআরআই ১-৫। এছাড়া প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৩৮টি উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করেছে।

একই সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৯টি ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ২০টি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড। আরও আছে সাদা ভুট্টা, সুইট কর্ন, বেবি কর্ন ও পপ কর্ন।

গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অনন্য অবদানের জন্য ২০২২ সালে স্বাধীনতা পদক পাওয়া বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পথচলা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর অধীনে ‘গম গবেষণা কেন্দ্র’ হিসেবে। 

২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৭’ অনুযায়ী দেশের গম ও ভুট্টা গবেষণা, জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। 

দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুরে স্থাপিত বিডব্লিউএমআরআই ১৪টি গবেষণা বিভাগ, ৫টি আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র (গাজীপুর, জামালপুর, রাজশাহী, যশোর ও হাটহাজারী), ১টি বীজ উৎপাদন কেন্দ্র (দেবীগঞ্জ) এবং ১টি বীজ উৎপাদন উপকেন্দ্র (ঠাকুরগাঁও) নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বিডব্লিউএমআরআই সনাতনী পদ্ধতির চাষের পরিবর্তন করে কৃষকদের মাঝে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। চাষাবাদে ২৫টি নতুন উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, চার-ফসলভিত্তিক লাভজনক ফসল ধারা, পাওয়ার টিলারচালিত বীজ বপন যন্ত্রের মাধ্যমে এক চাষে সারিতে বীজ বপন প্রযুক্তি (যার মাধ্যমে চাষের ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়), ব্লাস্ট রোগের সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা, ফল আর্মি ওয়ার্ম ব্যবস্থাপনাসহ অম্লীয় মাটি সংশোধনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিডব্লিউএমআরআই।

সীমিত সম্পদ, গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, অপ্রতুল জনবল এবং গবেষণা মাঠের অপর্যাপ্ততা সত্ত্বেও গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মান অর্জনে কাজ করছে। 

গবেষণার ফলাফল ব্যবহার করে দেশের বাইরে ভারত, নেপাল, বলিভিয়া ও জাম্বিয়ায় ১০টি ব্লাস্ট-প্রতিরোধী গমের জাত অবমুক্ত করেছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলার তরঙ্গিনী গ্রামের কৃষক মো. দবিরুল ইসলাম বলেন, আগে গমের ফলন ও উৎপাদন তুলনামূলক কম ছিল। যে পরিমাণ জমিতে গম চাষ করতাম, এখন করছি তার মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ জমিতে। তবে আগে প্রতি বিঘা (৪৮ শতাংশ) জমিতে ৫ থেকে ৮ মণ ফলন হতো। এখন সেখানে প্রতি বিঘায় ৩২-৩৩ মণ পর্যন্ত গম উৎপাদিত হচ্ছে। আবার এক বিঘা জমিতে ৮০ থেকে ৯০ মণ পর্যন্ত ভুট্টা উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা আবারও গম ও ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

বিডব্লিউএমআরআই জানায়, দেশে গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টন, এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ টন। চাহিদা পূরণে প্রতিবছর ২৪ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৭০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. মাহফুজ বাজ্জাজ বাসসকে বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও আমাদের বিজ্ঞানীরা তাপসহনশীল, ব্লাস্ট-প্রতিরোধী, স্বল্পমেয়াদি ও জিংকসমৃদ্ধ গমের জাত এবং উচ্চফলনশীল ভুট্টার জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের অভিযোজন সক্ষমতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে আমাদের লক্ষ্য শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও অধিক উৎপাদনশীল দানাদার ফসলের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের আমদানি-নির্ভরতা কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।