শিরোনাম

\ নাসিরউদ্দিন লিটন \
ঢাকা দক্ষিণ, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অবস্থিত দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদটি প্রায় দেড়'শ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক নবাবি আমলের এ মসজিদটি স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছে এক গর্বের নাম। কালের পরিক্রমায় কিছু সংস্কার কাজ হলেও মূল নকশা ও স্থাপত্যশৈলীতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি এখনো। এর দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিনই আসেন দর্শনার্থীরা।
স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ইউনেসকো কর্তৃক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে মসজিদটি। মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে কেরানীগঞ্জের ঐতিহাসিক হানাফিয়া জামে মসজিদকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস:
কেরানীগঞ্জ উপজেলার কোন্ডা ইউনিয়নের দোলেশ্বর গ্রামে বাংলা ১২৭৫ সনে (ইংরেজি ১৮৬৮, হিজরি ১২৮৫) দারোগা আমিনউদ্দিন আহাম্মদ নিজ উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। জনশ্রুতি রয়েছে, দারোগা আমিনউদ্দিন আহাম্মদ মসজিদটির নির্মাণে প্রথম উদ্যোক্তা হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘দারোগা মসজিদ’ নামেও পরিচিত ছিল।
মসজিদের সামনে স্থাপন করা সাইনবোর্ডের তথ্য থেকে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে সর্বপ্রথম মসজিদটির বর্ধিত অংশ নির্মাণ করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে সর্বশেষ সংস্কারকাজ করা হয়। তবে পুরোনো মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয় নতুন আরেকটি মসজিদ। এ কারণে পুরোনো মসজিদটি এখন গ্রন্থাগার ও মক্তব হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থাপত্য ও নকশার অনন্যতা:
এ হানাফিয়া জামে মসজিদটি লাল ইটে নির্মিত, যা বাংলার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর প্রাচীন নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মিল রয়েছে। মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এক গম্বুজবিশিষ্ট নকশা। গম্বুজটি উঁচু ও গোলাকৃতির। গম্বুজের চারপাশে ছোট ছোট মিনার স্থাপন করা হয়েছে। মসজিদের প্রবেশপথে খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে, যার ওপরের অংশে সূক্ষ্ম কারুকার্য খোদাই করা। সামনের দেয়ালে ও প্রবেশপথের চারপাশেও খোদাই করা নকশা দেখা যায়। মসজিদের অভ্যন্তরের অংশটি উঁচু ও প্রশস্ত, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া মসজিদের আশপাশে সবুজ ঘাস ও ছোট ছোট গাছের সমাহার রয়েছে। পাশেই একটি জলাধার রয়েছে, যেখানে মসজিদের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেসকোর এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ডস ফর কালচারাল হেরিটেজ কনজারভেশনে ‘অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়। একই মাসের ১৬ ডিসেম্বর সৌদি আরবের আবদুল লতিফ ফাওজান আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘মসজিদ স্থাপত্য শিল্পবিষয়ক অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হয় মসজিদটি। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ইসা বিন ইউসেফ বিন আল-দুহাইলান মসজিদটি পরিদর্শন করেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হানাফিয়া জামে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৪৩.৫ ফুট (৪৩ ফুট ৬ ইঞ্চি) এবং এর প্রস্থ ২৭ ফুট। এছাড়া দৃাষ্টনন্দন গম্বুজসহ মসজিদটির সর্বমোট উচ্চতা হহবে ১৮ ফুট।
মসজিদের ইমাম মুফতি আব্দুল কাবির ফিরোজী বলেন, ‘মসজিদটির প্রাচীন ঐতিহ্য ও লাল ইটের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে এর সংস্কার করাই ছিল আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী স্বাভাবিকভাবেই ভেতরটাকে শীতল রাখে, যা ভেতরে প্রবেশকারী প্রত্যেককে এক প্রশান্তিদায়ক অভিজ্ঞতা প্রদান করে।’
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র:
দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদটি ইউনেসকো ও সৌদি সরকারের পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার পর থেকেই মসজিদটি দেশ-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি কারছে। এটি দর্শনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে মসজিদটি দেখতে আসা আমিনুল ইসলাম বলেন, দেড়’শ বছরের বেশি পুরোনো এই মসজিদের ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেনেছি। সেই কৌতূহল থেকে মসজিদটি দেখতে আসা।
পুরাতন ঢাকার বংশাল থেকে সপরিবারে আসা মুহাম্মদ রহমান বেপারী এর নকশাকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করে বলেন, এটি ‘শুধু কেরানীগঞ্জের নয়, সমগ্র জাতির গর্ব।’
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রী শীলা আহমেদ বলেন, দেড় শতাব্দী পরেও এর সৌন্দর্য মুগ্ধ করার মতো। মনে হয় যেন এই স্থাপত্যটি ইতিহাসের গল্প বলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান খোকনের মতে এই বৈশ্বিক মনোযোগ অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। তিনি বলেন, এ মসজিদ দেখেই আমি বড় হয়েছি। এর মূল সত্তা অক্ষুণ্ন রেখে এটিকে পুনরুদ্ধার করায় এটি নতুন জীবন পেয়েছে।
স্থানীয় সমাজসেবক আয়াত উল্লাহ চৌধুরী সায়মন বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারিভাবে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রতিদিন মসজিদ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসছে। তাই সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি দাবি জানাই এখনই এ বিষয়ে নজর দেয়ার।
তিনি আরও দাবি জানান, এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে কেরানীগঞ্জের ঐতিহাসিক হানাফিয়া জামে মসজিদকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খানম মিতা বাসস’কে বলেন, ‘বর্তমানে ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছোট-ছোট ভিডিও কনটেন্ট দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও প্রাচীন মসজিদ পরিদর্শনের আগ্রহ বাড়ছে। মানুষ এসব ভিডিও দেখে উৎসাহিত হয়ে এসব স্থানে ঘুরতে আসেন এবং নিজের চোখে ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখতে চান।’
প্রাচীন স্থাপনা পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, ‘আগ্রহীদের ‘মহাপরিচালক, ‘প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর (আগারগাঁও, ঢাকা)’ বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদন জমা হওয়ার পর অধিদপ্তর থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে স্থানটি পরিদর্শনে যাবে। যাচাই-পদ্ধতি শেষে স্থাপনাটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি বা প্রত্নস্থল হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’