শিরোনাম

\ আবু মোশাররফ \
চট্টগ্রাম, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : মাটি ও পরিবেশকে রাসায়নিক দূষণ থেকে রক্ষার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে জৈব সার তৈরি করছেন চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম। বংশ পরম্পরায় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই উচ্চশিক্ষিত তরুণ তার উৎপাদিত জৈব সার সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান।
চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে চলমান বৃক্ষমেলায় বাসসের সঙ্গে আলাপকালে ‘জান্নাতশপ.সিটিজি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম তার এ উদ্যোগের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ ও প্রাণীদেহের জন্য তা চরম ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে মাটি ও পরিবেশকে রক্ষা করতে জৈব সার ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।’
এক সময় শুধু ধান-গমের মতো খাদ্যশস্য উৎপাদনে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হলেও গত এক দশকে সাধারণ গাছ লাগাতেও রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চাহিদা বাড়ায় দেশি-বিদেশি অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এখন গাছের রাসায়নিক সার বাজারজাত করছে, আর মানুষ বুঝে অথবা না বুঝেই গাছের বৃদ্ধির জন্য এসব সার কিনে নিয়ে ব্যবহারও করছে। এতে প্রকৃতি ও পরিবেশে প্রতিটি স্তরে রাসায়নিক দূষণ ঘটেই চলেছে, মাটি হয়ে গেছে বিষাক্ত। সেই মাটি থেকে উৎপাদিত ফসল খাদ্যশৃঙ্খলের সাথে মানবদেহে ঢুকে পড়ছে। এতে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে নীরবে, নিজেদের অজান্তেই।
তিনি বলেন, ‘এখনই রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, কেননা এমনিতেই অনেক সময় পার হয়ে গেছে। দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি সুস্থ না থাকলে আমরা কেউই সুস্থ থাকতে পারব না। দেশকে বাঁচাতে হবে। আমরা যদি ফসল উৎপাদন কিংবা গাছ লাগাতে জৈব সার ব্যবহার করি তাহলে সেটা দেশের মাটির বিশুদ্ধতা রক্ষা করবে, নিজেদের স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং আমাদের অর্থও সাশ্রয় করবে।’
তাওয়াবুল ইসলাম জানান, ২০০৫ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি বাগান করা শুরু করেন। সে সময় ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সার কেনার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প হিসেবে রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, কিচেন কম্পোস্ট ও গোবর ব্যবহার শুরু করেন। পরবর্তীতে এসব উপাদান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি জৈব সার তৈরির উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন, কাঁচা গোবর সরাসরি গাছে ব্যবহার করা ক্ষতিকর হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনার পর তিনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি শুরু করেন।
তিনি আরও জানান, রান্নাঘরে রোজ যে আবর্জনা বা শাকসবজির খোসা জমে তার সঙ্গে ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার, পচা পাতা, ধানের তুষ, খড়, ডিমের খোসা, হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি, নিম খৈল, সরিষার খৈল ও গাছের ছালসহ প্রায় ১৫ ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে জৈব সার তৈরি করেন তিনি।
এর দাম প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৮০ টাকা। গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে একবার এই সার ব্যবহারের পর প্রায় চার মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, দেশের মাটি ও পরিবেশ রক্ষার চিন্তা থেকেই জৈব সার বাজারজাত করছি। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, রাসায়নিকের ব্যবহারে মাটির পিএইচ লেভেল ঠিক থাকে না কিন্তু জৈব সারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় না, পরিবেশেরও ক্ষতি হয় না। প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রকৃতিতেই মিশে যায়, মাঝে শুধু উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি যোগায়।
সরকার দেশের মানুষকে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলে জৈব সার বিপ্লব একটি ভিন্ন মাত্রা পাবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে, জৈব সার হলেও তার ব্যবহারে সঠিক মাত্রা সম্পর্কে জানা ও প্রয়োগে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান এ বিষয়ে বাসস’কে বলেন, জৈব উপাদান সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করলে মাটির জৈব পদার্থ, পানি ধারণক্ষমতা, মাটির গঠন এবং উপকারী অণুজীবের কার্যক্রম বাড়তে পারে। তবে প্রাকৃতিক উপাদান মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ- এ ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তিনি বলেন, কাঁচা গোবর যথাযথভাবে পচানো ও পরিপক্ব না করে ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে হাড়, শিং, খৈল বা রান্নাঘরের বর্জ্যের পরিমাণ ও মিশ্রণের অনুপাত সঠিক না হলে মাটিতে অতিরিক্ত পুষ্টি জমতে পারে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস মাটির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাশয়ও দূষিত করতে পারে।
অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান আরও বলেন, জৈব সার ও রাসায়নিক সারকে শুধু ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ হিসেবে ভাগ করা ঠিক নয়। সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সার উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। মূল বিষয় হলো মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক সার, সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ে ব্যবহার করা।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সার কেনার সময় শুধু দাম বা গাছ কত দ্রুত বড় হবে তা বিবেচনা না করে মাটির জন্য সেটি কতটা নিরাপদ, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকৃতির অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে পুনরায় কৃষি ও উদ্ভিদ পরিচর্যার কাজে ব্যবহার করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতিকে দেখতে হবে একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য চক্র হিসেবে। ধান থেকে তুষ, গাছ থেকে পাতা-ছাল, পশু থেকে হাড়—যা মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয়, প্রকৃতির কাছে তারও মূল্য আছে। সেই মূল্যকে কৃষি ও উদ্ভিদ পরিচর্যার কাজে ফিরিয়ে দেওয়াই হবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মূল লড়াই।
সঠিক প্রক্রিয়ায় জৈব সার উৎপাদন ও মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিকভাবে তা ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং টেকসই কৃষিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। পরিবেশবান্ধব কৃষির এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের তরুণের উদ্যোগটি জৈব উপাদানের পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ উদ্ভিদ পরিচর্যায় নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে।