বাসস
  ১০ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৫

চট্টগ্রাম সফরে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করলেন প্রধানমন্ত্রী

ছবি : বাসস

আবু মোশাররফ

চট্টগ্রাম, ১০ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর উপলক্ষ্যে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কিছু তোরণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু আগের দিন রাতে পুলিশে সেগুলো খুলে ফেলে।

কারণ হিসেবে পুলিশ জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো অপ্রয়োজনীয় তোরণ, ব্যানার লাগানো যাবে না এবং অযথা খরচের দরকার নেই।’

বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী বাসসকে এই তথ্য জানান। 

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং নতুন বন্দোবস্তির কথা বলেন; তা যে কেবলই কথার কথা নয় তিনি বাস্তবেও প্রমাণ করে চলেছেন। এবারের চট্টগ্রাম সফরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বভাবসুলভ সাধারণ কিছু ঘটনায় মানুষের মধ্যে তাক লাগিয়ে দিছেন। পুরো বাঁশখালীর মানুষের মধ্যে দু’দিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়েই আলোচনা চলছে।’

ছবি: বাসস

বাহারছড়া সমুদ্র উপকূল সংলগ্ন এলাকার পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বন্যায় গৃহহারা একশ’ পরিবারকে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

গতানুগতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে চাবি তুলে দিয়েই দায় এড়াননি প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান। ঘরগুলো কেমন হয়েছে এবং কাদের দেওয়া হচ্ছে—সেটিও নিজেই পর্যবেক্ষণ করেছেন।

অনুষ্ঠানস্থল থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে এক বিধবাকে উপহারের নতুন ঘর দেওয়া হয়েছে। সেই ঘরেও যান প্রধানমন্ত্রী। সরকারিভাবে নির্মিত ঘরটি ঘুরে দেখেন এবং যাকে ঘরটি দেওয়া হচ্ছে সেই নারী ও তার সন্তানদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী কথা বললেন। ওই নারীর স্বামী মারা গেছেন দুই বছর আগে। তাদের চার মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। পরিবারের সবার খোঁজখবর নেওয়ার পর সেই ভিটাতে একটি গাছ লাগান প্রধানমন্ত্রী।

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নির্মিত ঘর সরেজমিনে পরিদর্শন, সাধারণ মানুষের মতো করে সবার খোঁজ নেওয়া— প্রধানমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ডে ওই বিধবা নারী তো বটেই পুরো বাঁশখালীর মানুষই অবাক বনে যান।

ঘর পাওয়া নারী জানান, ‘সরকার ঘর করে দিয়েছে সেটা তো জানতাম কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজে আমার ঘরে এসে কথা বলবেন এটা ভাবতেই পারিনি, স্বপ্নের মতো লাগছে। আমরা সবাই অবাক হয়ে গেছি, আল্লাহ তাকে রহমত দান করুন।’

বাহারছড়ার দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ কৃষক শামসুল আলম বলেন, ‘আমি জিয়াউর রহমানকে দেখেছি, বেগম খালেদা জিয়াকে দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী তারেককেও দেখতে এলাম। জিয়া পরিবারের সবাইকে আমার খুব পছন্দ।’

স্থানীয়রা বিএনপি নেতৃবৃন্দ জানান, বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রীর পৌঁছার কথা ছিল বেলা সাড়ে ১২টায়। কিন্তু সকাল সাড়ে ৮টার দিকেই পুরো এলাকা লোকে লোকারণ হয়ে যায়। আশপাশের উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো থেকে পায়ে হেঁটে এবং অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে যানবাহনে চড়ে হাজার হাজার মানুষ স্কুল মাঠে জড়ো হন তারেক রহমানকে এক পলক দেখার জন্য।

ছবি: বাসস

তিনি আরও জানান, সকাল থেকে তীব্র গরম উপেক্ষা করে সবাই অপেক্ষা করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আগমনের। দলের উদ্যোগে বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৮০টি বাসে করে নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালী থেকে অনুষ্ঠান শেষ করে ফটিকছড়িতে যান। সেখানে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

তারেক রহমান আগমন উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’পাশে এবং পেলাগাজী দিঘির সিএন্ডবি মাঠ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন হাজারো মানুষ। মানুষের চাপ সামলাতে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীকে কাছে থেকে এক পলক দেখার আশায় সড়কের দু’পাশে ঘরের চালা এবং গাছের উপর উঠে পড়েছে অনেক মানুষ। তারেক রহমানের গাড়িবহর সড়ক অতিক্রম করার সময় প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।

হেফাজতে ইসলামের আমিরের সাথে সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রী যখন মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভাস্থলে যাচ্ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অন্যরকম উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেন। প্রধানমন্ত্রী কাছে গিয়ে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।

ফটিকছড়ি থেকে প্রধানমন্ত্রী হাটহাজারীতে গিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি নির্মাণে সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ সহায়তার অর্থ তুলে দেন। সেখানেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বভাবসুলভ সরলতায় সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যান। তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাথে আলাদাভাবে কুশল বিনিময় করে তাদের উৎসাহ প্রদান করেন।

সন্ধ্যায় তারেক রহমান চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লু’র সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাংগঠনিক সভা করেন। সেখানে তিনি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে আশার আলো ছড়িয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেন এবং দলের দুর্নাম হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

সাংগঠনিক সভায় অংশ নেওয়া চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তি বাসস’কে বলেন, ‘আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন এবং দল ও দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন এবং কুশল বিনিময় করেছেন। দলের একজন সামান্য নেতাকে তিনি যেভাবে সম্মান দিয়েছেন তাতে আমি বিমোহিত।’

একই প্রসঙ্গে তারেক রহমান রাজনৈতিক দর্শনচর্চা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আলমগীর নূর বলেন, ‘তারেক রহমান তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা করায় আমরা সবাই উজ্জীবিত। তাঁর সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। আমি তাকে নাম বলার সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং আমার সংগঠনের প্রকাশিত কয়েকটি প্রকাশনা সাদরে গ্রহণ করেছেন। এটা আমার রাজনৈতিক জীবনের বড় প্রাপ্তি।’

প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বাসস’কে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার অসাধারণ গুণে গুণান্বিত আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমি ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রসা থেকে শুরু করে হাটহাজারীর প্রোগ্রাম এবং চট্টগ্রাম নগরীর প্রোগ্রামে সার্বক্ষণিক ছিলাম। তিনি যেখানেই গেছেন, তাকে ঘিরে সাধারণ মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাণোচ্ছ্বাস ছিল অতুলনীয়। প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাথে যেমন মিশে গেছেন তেমনি হাটহাজারীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রত্যেকের সাথেই কথা বলেছেন। যারাই তার সংস্পর্শে এসেছেন তারাই অবাক হয়ে গেছেন।’

সাংগঠনিক সভায় চট্টগ্রাম বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং দলের মূল কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে সমন্বয় করে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তিনি সবাইকে ‘একই পরিবারের সদস্য’ হিসেবে বর্ণনা করে পরস্পরের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকারও নির্দেশনাও দিয়েছেন। নির্বাচনে দলের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভ্রান্তি ও নানা ধরনের গুজবে কান না দিতে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক তৃণমূল নেতাকর্মী এসব তথ্য জানিয়েছেন।

গতকাল (রোববার) রাত সোয়া ৮ থেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক সভায় এসব নির্দেশনা দেন তিনি। সরকার গঠনের পর চট্টগ্রামের নেতাদের সঙ্গে এটিই ছিল বিএনপির চেয়ারম্যানের প্রথম সাংগঠনিক সভা।

সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের পারস্পরিক দূরত্ব ও বিভাজন এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে মূল বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি। দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে পরস্পরের সহযোগী হিসেবে কাজ করার কথা বলেন।

সরকারের কার্যক্রমকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে দেখার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সভায় উপস্থিত এক নেতা বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল ঐক্য। তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনকেও শক্তিশালী করতে হবে। সেজন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় থাকতে হবে।’

এছাড়াও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়েও নেতাদের সতর্ক করেছেন তারেক রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস বা প্রচার না করতে নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন।

কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় দলের নেতাকর্মীরা যেন জড়িয়ে না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।