শিরোনাম

॥ মুহাম্মদ আমিনুল হক ॥
সুনামগঞ্জ, ৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জ। এখানকার দুর্গম এলাকায় বর্ষায় নাও, হেমন্তে পা। অর্থাৎ বর্ষায় নৌকা আর হেমন্তে পায়ে হেটে চলাচল করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। এ কারণে শিক্ষায় পিছিয়ে আছে হাওরপাড়ের জনগোষ্ঠী।
কোনো রকম পাঠশালা শেষ করে রাজধানীমুখী হয় অধিকাংশ মানুষ। শিশু শ্রম ও বাল্য বিয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধের খপ্পরে পড়তে হয় এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে। এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে প্রয়োজন জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা।
জেলার, দিরাই, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা এ ৫ উপজেলা একদম দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এসব উপজেলার মানুষ তাদের সন্তানদের বর্ষাকালে বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকা দুর্গম হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। এসব হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় অস্বস্তিতে আছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
এ বছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওরাঞ্চলের একাধিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। প্রতিমন্ত্রী হাওর এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর করতে বিষয়ভিত্তিক মৌলিক পাঠদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা সেবা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
হাওর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম ভুইয়া বলেন, বর্ষাকালে সকল রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকানির্ভর হয়ে পড়ে গোটা হাওরাঞ্চল। দুর্গম হাওরের একেকটা গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এ সময় পানিবন্দী মানুষ দৈনন্দিন কাজ করতে নৌকাযোগে যত্রতত্র যাতায়াত করেন।
অন্যদিকে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হন ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। বর্ষা মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টি, আফাল, বজ্রপাত ও নৌকাডুবির মতো ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে হাওর ও নদী পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী। ফলে পাঠ গ্রহণে অনীহা, শিখন ঘাটতি ও ঝরে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের ঝুঁকিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিতে নিরাপদ নৌযানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন সচেতন মানুষগুলো।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ হাজার ৪৭৩টি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১২৯টি, দোয়ারাবাজারে ১০৪টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৭৮টি, ছাতকে ১৮৫টি, তাহিরপুরে ১৩৪টি, জামালগঞ্জে ১২৬টি, ধর্মপাশায় ১১০টি, শাল্লায় ১০৫টি, দিরাইয়ে ১৬৩টি, জগন্নাথপুরে ১৫৮টি, শান্তিগঞ্জে ৯৭টি ও মধ্যনগরে ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। জেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয়ই দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
মধ্যনগর উপজেলার রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ আমজোড়া নূরুনাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাহিরপুর উপজেলার জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
জামালগঞ্জ উপজেলার হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনারবাঁক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শাল্লা উপজেলার শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়ারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয় বর্ষায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পতিত হয়।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়াডহর হাওর এলাকায় মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটিতে শিক্ষার্থী আছে ৭৬ জন ও অন্যটিতে ৯৪ জন।
হাওরের মাঝে খণ্ড, খণ্ড পাড়া মিলে মির্জাপুর গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের এসব গ্রামের সব ছাত্র-ছাত্রী বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। তারা নিজেরা নৌকা বেয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। ঝড়-বৃষ্টি থাকলে উপস্থিতি কমে যায় বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী নতুন হাটির সাইদুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে। ছোট ছেলে আইজুল প্রথম শ্রেণির ছাত্র। একমাত্র মেয়ে রিয়া মনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। বড় ছেলে কোনোরকম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও নানা বাধ্য-বাধকতায় শিক্ষাজীবন আর এগোয়নি।
স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়ির পার্শ্ববর্তী প্রায় ৩০০শ’ ফুট রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। সাইদুর রহমান বলেন, কেউ পানি ভাইঙ্গা যায়। কেউ আবার নৌকা দিয়া স্কুলে আসা-যাওয়া করে। সরকারিভাবে একটা নৌকা দিলে স্কুলে আসতে-যেতে ছাত্র-ছাত্রীদের খুব উপকার হতো।
মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চমক কান্তি তালুকদার বাসসকে বলেন, আমরা এক্কেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চারপাশে শুধু পানি আর পানি। ছাত্র-ছাত্রীরা নৌকা বেয়েই স্কুলে আসে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ছাত্ররা তেমন আসে না।
লামাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে। ১৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেখা করছে ওই বিদ্যালয়ে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তারের ভাষ্য, আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসে না। নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে নাসরিন আক্তার বলেন, ছাত্র-ছাত্রী নিজেরা নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে।
তিনি বলেন, ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখী হতে হয় তাদের। সরকারিভাবে নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলে ঝুঁকি এড়ানো অনেকটা সম্ভব হতো।
লামাগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিফ ও ইসরাত জাহান নোহা জানিয়েছে, তাদেরকে নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। অনেকের নৌকা নেই। দিন খারাপ থাকলে তারা আসে না। বৃষ্টি থাকলে বইপত্র ও কাপড়চোপড় ভিজে যায়। ভেজা শরীরে ক্লাস করতে হয় বলে জানিয়েছেন তারা।
রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, শিশু ছাত্র-ছাত্রীরা হরহামেশাই ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের স্কুলে যাতায়াতের মাধ্যম একমাত্র নৌকা। হাওরপাড়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সরকারি বিশেষ উদ্যোগ।
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, প্রকৃতিনির্ভর জীবন-জীবিকা বাদ দিলে সামনে চলে আসে হাওরের দুর্যোগপূর্ণ শিক্ষা পরিস্থিতি। বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে নৌকা বেয়ে বিদ্যালয়ে যায় শিশুরা। নৌকাডুবি, ঝড়-ঝাপ্টা ও বজ্রপাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে বর্ষা মৌসুমের মাসছয়েক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে শিক্ষার্থীরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বাসসকে বলেন, সুনামগঞ্জ -১ আসনের সংসদ সদস্যের উদ্যোগে ১৬ টি নৌকা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তাহিরপুরের বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, হাওর এলাকার শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা উনাকে বলা হয়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন। আশা করি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।