বাসস
  ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৫

কাঁঠালের বিস্কুট তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন গাজীপুরে আব্দুস সাত্তার 

ছবি: বাসস

॥ মুহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ॥

গাজীপুর, ৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): ভরা মৌসুমে লাল মাটির উর্বরতায় গাছপাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুগন্ধিতে মুখরিত থাকে গাজীপুরের গ্রাম-গঞ্জ ও হাট-বাজার। তবে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের উপযুক্ত সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় প্রতি বছরই গাছে ও বাগানে পঁচে নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল। 

সেই লোকসানের গল্প বদলে দিতে এবার জেলার শ্রীপুর উপজেলায় এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া। সাধারণ ফল হিসেবে বিক্রি কিংবা অপচয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে তিনি জাতীয় ফল কাঁঠাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছেন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ‘কাঁঠাল বিস্কুট’। 

কোনো প্রকার কৃত্রিম ফ্লেভার বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ছাড়াই প্রস্তুত করা এ উদ্ভাবনী বিস্কুট এখন অফলাইন ও অনলাইনে সমানভাবে বাজার মাতিয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

গাজীপুর জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এ জেলায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। যার সিংহভাগ অর্থাৎ সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি উৎপাদন হয় কেবল শ্রীপুর উপজেলায়। 

উঁচু লাল মাটির গুণাগুণের কারণে শ্রীপুরের কাঁঠাল তার অনন্য স্বাদ, মিষ্টতা ও ঘ্রাণের জন্য সারা দেশেই সুপরিচিত। তবে বৈশাখ থেকে ভাদ্র এ দীর্ঘ মৌসুমে বাজারে একসংগে বিপুল পরিমাণ কাঁঠালের জোগান থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে দাম পড়ে যায় এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া বাসসকে জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলেন কীভাবে এ মৌসুমি অপচয় বন্ধ করে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করা যায়। নিজের বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এ সংকটকে রূপ দিয়েছেন সম্ভাবনায়। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোতে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে চিপস, ক্যান্ডি, জ্যাম ও বিভিন্ন মুখরোচক খাদ্য তৈরির চিত্র দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। দেশে ফিরে শ্রীপুরের বৈরাগীরচালা গ্রামের নিজের কারখানা ‘মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলস’-এর অধীনে ‘মেহমান ফুড’ ব্যানারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০টি পাকা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে তিনি বিস্কুট উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করেন। এই বিস্কুটের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো কৃত্রিম কাঁঠালের ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না। প্রতিটি বিস্কুটে প্রায় ২০ শতাংশ তাজা ও প্রাকৃতিক কাঁঠালের পাল্প ব্যবহার করা হয়। এর সংগে ঘি, বাটার, উন্নতমানের দুধ, ময়দা এবং অন্যান্য উপাদান স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মেশানো হয়।
উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, প্রথমে খাঁটি পাকা কাঁঠালের কোষ ছড়িয়ে বীজ আলাদা করে তা ব্লেন্ড করা হয়। এরপর স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর নয়, এমন নিয়মে মিক্সার মেশিনে কাঁঠালের ঘন রসের সংগে বাটার, ঘি, দুধ ও ময়দা দিয়ে মাখিয়ে মণ্ড বা ডো তৈরি করা হয়। পরে টেবিল-টপে তা ডাইসের সাহায্যে নির্দিষ্ট বিস্কুটের আকারে কাটা হয়। প্রতি ট্রেতে ৩৬ পিস বিস্কুট সাজিয়ে ৩৬টি ট্রে এক সংগে ট্রলিতে করে বিশেষ ওভেনে ঢুকানো হয়। প্রায় ২৫ মিনিট নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বেক করার পর ওভেন থেকে বের করা হয়। বিস্কুট সম্পূর্ণ ঠান্ডা হলে তা সুন্দর ও বায়ুরোধক বক্সে প্যাকেটজাত করা হয়। বর্তমানে প্রতি প্যাকেটে ৮০০ থেকে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে, যার বিক্রয়মূল্য রাখা হয়েছে ৭৫০ টাকা।

বাজারজাতকরণের শুরু থেকেই ‘মেহমান ফুড’-এর কাঁঠাল বিস্কুট নিয়ে নেটিজেন ও ভোক্তাদের মাঝে দারুণ কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। 

স্থানীয় কুরিয়ার কর্মী রাকিব জানান, গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন এই বিস্কুটের বেশ কিছু অনলাইন অর্ডার কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। একবার যে ভোক্তা এটি কিনছেন, তারা পুনরায় অর্ডার দিচ্ছেন। 

কাঁঠাল বিস্কুট কিনতে আসা স্থানীয় আব্দুল হালিম বলেন, প্রথমে কেবল কৌতূহল থেকেই বিস্কুটটি কিনেছিলাম। কিন্তু খাওয়ার পর খাঁটি কাঁঠালের সুবাস আর চমৎকার স্বাদ পেয়ে আবার কিনতে এসেছি। এর মাধ্যমে এখন বছরের যেকোনো সময়েই কাঁঠালের স্বাদ নেওয়া সম্ভব।’

আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার এ উদ্যোগ শুধু একটি নতুন খাদ্যপণ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং স্থানীয় কাঁঠালচাষিদের মাঝে নতুন অর্থনৈতিক আশার আলো জ্বালিয়েছে। 

স্থানীয় প্রবীণ চাষি আবু বক্কর বাসসকে বলেন, সঠিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ফল বাগানেই পঁচে গলে নষ্ট হতো। এখন প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কাঁঠালের নতুন বাজার তৈরি হওয়ায় চাষিরা ফলের সঠিক দাম পাবেন বলে আশা করছেন।

প্রযুক্তি ও গবেষণাগারের দিক থেকেও এ উদ্যোগকে শতভাগ সময়োপযোগী বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, জাতীয় ফল কাঁঠালের প্রচুর উৎপাদন হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতি বছর এক-তৃতীয়াংশ অপচয় হয়। অপচয় রুখতে বারি ইতোমধ্যে ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। 

তিনি বলেন, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ও পাকা কাঁঠালের শুকানো পাউডার এবং জুসে প্রচুর প্রোটিন, ফাইবার, মিনারেলস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব পুষ্টি উপাদান দিয়ে বিস্কুট, কেক, পাপড়, ক্যান্ডি বা আইসক্রিম তৈরি করলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখবে।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাসসকে বলেন, বর্তমানে দেশে কাঁঠাল দিয়ে প্রায় ৫২ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর মধ্যে কিছু পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার এ উদ্ভাবন প্রশংসনীয়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া বাসসকে বলেন, বিস্কুটের অভূতপূর্ব সাড়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে কাঁঠালের চিপস, জ্যাম ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে নতুন এ উদীয়মান শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং সাধারণ ভোক্তার কাছে পণ্য আরও সুলভ মূল্যে পৌঁছে দিতে এসব প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর সরকার যেন ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ করে, তিনি এ বিনীত আহ্বান জানান। 

তার মতে, সরকার ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে জাতীয় ফলের এই বহুমুখী ব্যবহার দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।