বাসস
  ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৫৪

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদল কর্মী মামুনের শরীরই হয়ে উঠেছিলো প্রতিবাদের মানবদেয়াল

কোলাজ ছবি

রেদ্ওয়ান আহমদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : শহীদ নূর হোসেন। নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি ছবি, যার বুকে লেখা ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’। যিনি ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নিহত হোন। রাজপথে দাঁড়ানো সেই প্রতিবাদী শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যুর প্রায় চার দশক পর, চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের রাজপথে যেনো দেখা মিলেছিলো তারই আরেক প্রতিচ্ছবি। তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মামুন ছিলেন ছাত্রদলকর্মী। যিনি একই বিভাগের শিক্ষার্থী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার সহপাঠী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যার বুকে-পিঠে ‘ফ্রি কোটা অর ডাই’, ‘কোটা থেকে মুক্তি দে, নইলে মোরে কবর দে’ এবং ‘দফা ১ দাবি ১, ‘কোটা নট কামব্যাক’ লেখা স্লোগানগুলো তখন দেশে-বিদেশে ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

আব্দুল্লাহ আল মামুন ময়মনসিংহ সদরের চরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম বার্তিপাড়ার এক কৃষক পরিবারে বেড়ে উঠেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সে। ভৌগলিক, পারিবারিক ও আর্থিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে মামুন ২০২২ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। 

কিন্তু কে জানতো, পরিবারের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেটাই একদিন স্লোগান তুলবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারিতে। কে জানতো, সহপাঠী হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে সে একই গণ-অভ্যুত্থানে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে। হারিয়ে ফেলবে একই বিভাগের ছোটভাই শহীদ ফরহাদ হোসেনকে। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একদম শুরুতে চট্টগ্রামের রাজপথে সম্মুখসারিতে ছিলেন মামুন। মামুনের দাবি, তার বুকে লেখা- ‘ফ্রি কোটা অর ডাই’, স্লোগানের ছবিটি প্রথম একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় প্রকাশ হয়। পরে সেটি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে, যা আন্দোলনকারীদের মনে ব্যাপক সাহস জোগায়।

মামুন বলেন, ‘১৫০ টাকা দিয়ে এক কৌটা রঙ কিনে টানা তিনদিন নিজের বুকে-পিঠে বিভিন্ন স্লোগান লিখেছিলাম। ৬-৮ জুলাই বুকে লিখেছিলাম, ‘চাষার ছেলে চাষা কেন?’ এবং ‘কোটা থেকে মুক্তি দে, নইলে মোরে কবর দে’, ‘ফ্রি কোটা অর ডাই’, এবং ‘দফা ১ দাবি ১, ও ‘কোটা নট কামব্যাক’।

এসব স্লোগান বুকে-পিঠে লিখে মামুন চবির শহীদ মিনার ও এক নম্বর গেট, ষোলশহর স্টেশন, টাইগারপাস, মুরাদপুর, নিউমার্কেট ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। মিছিল এবং বিক্ষোভের একদম সামনে একটি জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। 

কেনো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন, প্রশ্নের উত্তরে মামুন বলেন, ‘গত ১৫ বছরে তিনটা অবৈধ নির্বাচন, গুম, খুন, বিরোধী মত দমন, মামলা হামলা, মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এই অপকর্মগুলো আমাকে স্বৈরাচার খুনি হাসিনার প্রতি ক্ষুব্ধ করেছিলো।’

তবে, আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকার কারণে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন মামুন। বিভিন্ন সময়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং পুলিশও তাকে তাড়া করতো। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তার কারণে একটা বাসায় টানা দুই দিনও ঘুমাতে পারিনি। প্রতিনিয়ত আমাদের বাসা বদলাতে হতো।’

১৫ জুলাই মুরাদপুরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন বলে জানান মামুন। তিনি বলেন, ‘সেদিন বাস থেকে নামার পরপরই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমার ওপর হামলা চালায়। সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে একটি গলিতে আশ্রয় নেই। পরে আমার মায়ের বয়সী এক নারী আমাকে নিজের ছেলের টি-শার্ট পরিয়ে হোটেলের কর্মচারী সাজিয়ে হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেন।’

তিনি জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে মামুনের পরিবার যখন তার ছবিগুলো দেখলো, তখন তারা ভয়ে ছিলো। মামুন বলেন, ‘পরিবারের সবাই তখন আমাকে আন্দোলনে না যেতে, বাড়িতে চলে আসতে বলতো। কিন্তু আমি কারো কথা শুনিনি। ৪ তারিখ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার ছোটবোনকে বলেছিলাম, আমার কিছু টাকা ঋণ আছে, যদি কিছু হয়, তাহলে তারা যেনো সেটা শোধ করে দেয়।’

এসময় তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ বন্ধু হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার কথাও স্মরণ করেন। মামুন বলেন, ‘আন্দোলনের সামনে থাকার কারণে তরুয়া আমাকে একবার বলেছিলো, ‘মামুন, তোরে নিয়ে ভয় করে, যেভাবে খালি গায়ে মিছিলের সামনে চলে যাস, প্রথম গুলি তোর বুকে লাগবে।’ কিন্তু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে আমার আগে আমার বন্ধুর বুকটা ঝাঁঝরা করে দিলো ঘাতকরা। এই ব্যথা আমি আজও ভুলতে পারি না।’

আন্দোলনে অংশ নেওয়ার এই সাহস ও শক্তি কোথায় পেয়েছিলেন, জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘আরব বসন্তের নায়ক তিউনিসিয়ার বুয়াজিজি এবং স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেন আমাকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিতে দারুণভাবে সাহস জুগিয়েছে।’