বাসস
  ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২২

জনবল সংকটে গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ব্যাহত উপকূলের স্বাস্থ্যসেবা 

ছবি: বাসস

এনামুল হক এনা

পটুয়াখালী, ৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা সংকটে। ৪ লাখেরও বেশি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম সরকারি ভরসাস্থল এ হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পচ্ছে। কিন্তু অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধি না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

শুধু গলাচিপা উপজেলার বাসিন্দারাই নন, পাশের রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন এ হাসপাতালে আসেন। কিন্তু ৫০ শয্যার হাসপাতালটি বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ বহন করায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।

সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে শত শত রোগীর ভিড় লেগে আছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগী ভর্তি হওয়ায় অনেককেই শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় রোগীর স্বজনদেরও সংকীর্ণ পরিবেশে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, করিডোর ও কক্ষের দেয়াল এবং ছাদের আস্তর খসে পড়ছে। ভবনটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীরাও।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গাইনি বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা আলট্রাসনোগ্রাম প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মেশিন অচল থাকায় গর্ভবতী নারীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের সময় ও ভোগান্তিও বাড়ছে।

একইভাবে হাসপাতালটিতে আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে সেবাও চালু হয়নি। বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ফলে প্রয়োজনীয় এক্স-রে করাতে রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে জরুরি রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসেবে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ৫০ হলেও প্রতিদিন ইনডোরে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকেন। নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী সামলাতে গিয়ে হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থা চাপে পড়েছে।

জনবল সংকটও হাসপাতালের অন্যতম বড় সমস্যা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র মিলিয়ে অনুমোদিত ২৭৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৪২ জন। শূন্য রয়েছে ১৩১টি পদ।

এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ২২৭টি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন ১৩১ জন। শূন্য রয়েছে ৯৬টি পদ। 

অন্যদিকে, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে অনুমোদিত ৪৬টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১১ জন। দীর্ঘদিন ধরে ৩৫টি পদ শূন্য থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের সংকটও রয়েছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, রোগীর তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় বছরের শেষ দিকে ওষুধ ও পরীক্ষার উপকরণের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে অনেক রোগীই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন। 

পর্যাপ্ত কক্ষের অভাবেও চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন ঘটছে। অনেক সময় একই কক্ষে একাধিক চিকিৎসক রোগী দেখায় রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

গলাচিপা পৌর এলাকার বাসিন্দা প্রান্ত শীল বলেন, সরকারি হাসপাতালের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তিনি হাসপাতালটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন ভবন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান।

পৌর এলাকার বাসিন্দা সখিনা খাতুন বলেন, হাসপাতাল শুধু নামে আছে, কাজে নাই। প্রয়োজনীয় অনেক সেবা নাই এ হাসপাতালে। আমরা দ্রুত সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন হাসপাতালটিতে চিকিৎসার মান আরো উন্নত করা হয়।

চরকাজল ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. শাহ আলম বলেন, কম খরচে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে এলেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাইরে করাতে হওয়ায় দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবাহ উদ্দিন বাসস’কে বলেন, গলাচিপা ছাড়াও রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু মাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, রোগীর তুলনায় ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ অপর্যাপ্ত। বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের পরিবর্তে নতুন মেশিন সরবরাহের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনেরও প্রয়োজন রয়েছে।

হাসপাতালের ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবনটি পুরোনো হওয়ায় সংস্কারের পরও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে নতুন ভবন নির্মাণ এবং হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বাসস’কে বলেন, শুধু গলাচিপা নয়, পুরো জেলায় জনবল এবং যন্ত্রপাতি সংকট রয়েছে। আমরা খুব শীঘ্রই এ সঙ্কট মোকাবেলার জন্য তৃতীয় শ্রেণির জনবল নিয়োগ দেব। আশা করি তখন কিছুটা জনবল সঙ্কট কমবে। এছাড়া যন্ত্রপাতি সঙ্কটের বিষয়টা আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে গলাচিপা, রাঙ্গাবালী ও দশমিনাসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে।