শিরোনাম

/ মো. মজিবুর রহমান /
শরীয়তপুর, ২৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : কোভিড-১৯ মহামারীতে স্বামী রতন চন্দ্র মালো চাকরি হারালে তীব্র আর্থিক সংকেটে পরে পরিবারটি। সংসার চালাতে ধার দেনায় ডুবে যায় তারা। এমন দুঃসময়ে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় স্ত্রী তিথী মন্ডলের মনে একটি প্রশ্ন জাগে, ‘আমি কি কোনদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবো?’ যেই ভাবা সেই কাজ।
শরীয়তপুর জেলা শহরের পালং বাজারের পরিশ্রমী নারী তিথী মন্ডল। স্বামী রতন চন্দ্র মালো স্থানীয় একটি দোকানে সামান্য বেতনে কাজ করতেন। তার সীমিত আয়ে অতি কষ্টে চলতো তাদের চার সদস্যের সংসার।
কোভিড-মহামারীর সময়ে তিথী মন্ডল চারিদিকে দৌড়ঝাঁপ করে চাকরি খুঁজতে থাকেন। চাকরির তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোন কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় কিছু করতে পারছিলেন না। এমন অবস্থায় তিথী কমিউনিটিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রচারণা সভায় অংশগ্রহণ করে সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন। তাৎক্ষণিক তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ফ্যাশন গার্মেন্ট ট্রেডে শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণে যোগ দেন। এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিথী হাতে-কলমে সেলাই, কাপড় কাটা, পরিমাপ করা, মেশিন চালানো এবং গ্রাহক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
মাস্টারক্রাফটস পার্সন হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে তিনি দ্রুতই আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। সহজেই দর্জি কাজ রপ্ত করে ফেলেন। এর পাশাপাশি তিনি জীবনমান উন্নয়ন, গণযোগাযোগ, সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে বুৎপত্তি অর্জন করেন। যা তাকে নতুন উদ্যোগে অনুপ্রাণিত করে।
দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে তিথি স্বামীর অল্প কিছু সঞ্চয় ও শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এহডিএস)-এর রেইজ প্রকল্প থেকে ২১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শরীয়তপুর শহরের সৌদিয়ান মার্কেটে ‘ফ্যাশন টেইলার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তার ব্যবসা দিন-দিন সম্প্রসারিত হতে থাকে।
‘ফ্যাশন টেইলার্স’ প্রতিষ্ঠানে তিনি নারীদের পোশাক তৈরির পাশাপাশি থান কাপড় ও রেডিমেড পোশাক বিক্রি করেন। এর ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন কাস্টমার যোগ হয় তার প্রতিষ্ঠানের সাথে। ‘ফ্যাশন টেইলার্স’ এর উৎপাদিত পোশাকের চাহিদা সারা শরীয়তপুর জেলাব্যাপী। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাস্টমার এসে তার দোকানে পোশাক তৈরি করে এবং রেডিমেড ও থানা কাপড় ক্রয় করে। এ দোকান থেকে এখন তিনি মাসে গড়ে ৪০ হাজার টাকার বেশি আয় করেন। তিথীর এক ছেলে আপন (১৬) শরীয়তপুর পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মেয়ে অথৈ (১৫) স্থানীয় মজিদ জরিনা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী।
তিথী বাসসকে জানান, ‘স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি সংগঠন শরিয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস)-এর ‘রেইজ'প্রকল্প আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। আগে আমি সবার সামনে কথা বলতে ভয় পেতাম। এখন আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রাহক ও সমাজের নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলি এবং সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছি’।
বর্তমানে তিথী নিজকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গর্বে’র সাথে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি ও স্থানীয় বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তিথি'র এ সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে সঠিক নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ, সাহস ও ধৈর্য থাকলে একজন নারী নিজের ভাগ্য নিজেই রচনা করতে পারেন।
এসডিএস এর রেইজ প্রকল্প পরিচালক আবু আসলাম বাসস’কে বলেন, তিথী হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় আমাদের কাছে এসে রেস্ট প্রোগ্রাম থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে আমরা ঋণ প্রদান করি। তিনি ঋণের টাকা দিয়ে শরীয়তপুর জেলা শহরে সৌদিয়ান মার্কেটে ‘ফ্যাশন হাউজ’ নামে একটি টেলারিং দোকান চালু করেন। এর পর থেকে তিথীর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিথী এখন স্বাবলম্বী। ‘ফ্যাশন হাউজ’ এর আয় দিয়ে তিথী তার স্বামীকে ‘তিশা শিল্পালয়’ নামে একটি স্বর্ণের দোকান করে দিয়েছেন। সে দোকান থেকে মাসিক আয় করছেন ৪০ হাজার টাকার ওপরে।