শিরোনাম

॥ বেলাল রিজভী ॥
মাদারীপুর, ২৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফল চাষ করে শিবচরের রাসেল মিয়া এখন তরুণদের অনুপ্রেরণার উৎস। বাবার গড়ে তোলা দেড় বিঘার একটি ফলের বাগানকে পরিকল্পিত পরিচর্যা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ৮ বিঘায় সম্প্রসারণ করেছেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ফল স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে অনেক তরুণ এখন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফল চাষে ঝুকছেন।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া মৃধাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাসেল মিয়া দীর্ঘদিন বিদেশে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে তিনি বাবার গড়ে তোলা ফলের বাগানের দায়িত্ব নেন। শুরুতে কাক্সিক্ষত ফলন না পেলেও তিনি হতাশ হননি।
ওই সময় ইন্টারনেটে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন ভিডিও দেখে আধুনিক ফল চাষ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সেচ ও সার প্রয়োগের বিভিন্ন কৌশল শিখে সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে শুরু করেন তিনি। পরিকল্পিত পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ধীরে ধীরে বাগানের উৎপাদন বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার ৮ বিঘার বাগানে উন্নত জাতের পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, লেবুসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ হচ্ছে।
তার সমন্বিত বাগানের প্রতিটি গাছ নিয়মিত ছাঁটাই, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচর্যা করা হয়। এর ফলে ফলের উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি গুণগত মানও উন্নত হয়েছে। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক পরিচর্যার কারণে পেয়ারার ফলন আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি ও মানসম্মত হওয়ায় বাজারে এসব পেয়ারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ ক্রেতারাও সরাসরি বাগানে এসে গাছ থেকে পছন্দমতো ফল সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে ক্রেতারা তাজা ও নিরাপদ ফল পাচ্ছেন, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন উদ্যোক্তা। প্রতি কেজি পেয়ারা ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমাম হোসেন বলেন, ‘রাসেল মিয়া প্রবাস থেকে ফিরে আধুনিক পদ্ধতিতে একটি মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। এখানে বিভিন্ন ধরনের নিরাপদ, মানসম্মত ও সুস্বাদু ফল উৎপাদন হয়। আমরা নিয়মিত তার বাগান থেকে ফল কিনি। গাছ থেকে সরাসরি তাজা ফল সংগ্রহ করতে পারায় ক্রেতাদের আস্থাও বেড়েছে।’
আরেক বাসিন্দা অপূর্ব বলেন, ‘বেকার না থেকে কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেও যে সফল হওয়া যায়, রাসেল মিয়া তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সাফল্য অনেক তরুণকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস জোগাচ্ছে।’
সাইফুল শফিক বলেন, ‘রাসেল মিয়ার সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই এখন আধুনিক ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তার দেখাদেখি অনেক তরুণ কৃষিকাজে এগিয়ে আসছেন, যা স্থানীয় কৃষির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসছে।’
উদ্যোক্ত রাসেল মিয়া বলেন, ‘প্রবাসে থাকলেও সবসময় ইচ্ছা ছিল দেশে ফিরে নিজের কিছু করার। বাবার গড়া বাগান থেকেই সেই যাত্রা শুরু করি। প্রথম দিকে ফলন ভালো ছিল না। পরে ইন্টারনেট থেকে আধুনিক ফল চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি শিখে পরিচর্যার ধরন পরিবর্তন করি। আল্লাহর রহমতে এখন ভালো ফলন হচ্ছে। বিশেষ করে এ বছর পেয়ারার উৎপাদন ও মান দুটোই ভালো হয়েছে। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি বাগান থেকেই খুচরা বিক্রি করছি। প্রতিদিন অনেক ক্রেতা সরাসরি বাগানে আসছেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ফল চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।’
শিবচর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে শিবচর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৭০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হেক্টর জমিতে পেয়ারা, ৩ হেক্টর জমিতে মাল্টা এবং ১ হেক্টর জমিতে কমলার আবাদ হয়েছে। এছাড়া ড্রাগন ফল, লেবু ও অন্যান্য ফলের আবাদও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চারা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শে উপজেলার ফল চাষে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান বাসস’কে বলেন, কৃষি বিভাগ ফল চাষে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে। পাশাপাশি মানসম্মত চারা সরবরাহ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং কৃষি ঋণসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ফল চাষকে আরও লাভজনক করা সম্ভব। রাসেল মিয়ার মতো উদ্যোক্তাদের সাফল্য অন্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে নিরাপদ ফল উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আধুনিক ফল চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাসফেরত তরুণরা যদি পরিকল্পিতভাবে কৃষিতে বিনিয়োগ করেন, তবে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে দেশীয় ফলের উৎপাদনও বাড়বে। রাসেল মিয়ার উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি সফল উদাহরণ।
স্থানীয়দের মতে, রাসেল মিয়ার এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক প্রযুক্তি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষিও হতে পারে একটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা। নিজের মাটিতে থেকেই সফল হওয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে, রাসেল মিয়ার সাফল্য তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।