শিরোনাম

/ বিপুল ইসলাম /
লালমনিরহাট, ২৮ জুলাই ২০২৬ (বাসস): প্রায় ৪০ বছর ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে জেলার রেলওয়ে কোয়ার্টারের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা। অকেজো ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে শতাধিক কোয়ার্টার। এতে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিত্যক্ত ভবনগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
রেলের শহর হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২ হাজার ৯১৭ একর ৫৫ শতক জমির ওপর নির্মিত শতবর্ষী স্টাফ কোয়ার্টারের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, অবৈধ দখল ও সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। পরিত্যক্ত এসব ভবনের অনেকগুলোই মাদক সেবন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শহরের বড় অংশ জুড়ে রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি থাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে লালমনিরহাটের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী বলেন, অবৈধ দখলে থাকা কোয়ার্টার থেকে সরকার কোনো ভাড়া পাচ্ছে না। ফলে সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র।
লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান তালুকদার বাসসকে বলেন, রেলওয়ের জমির কারণে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জমি ব্যবস্থাপনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক আফিরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আধুনিক নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লালমনিরহাট জেলার ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৯০০ সালে পূর্ণাঙ্গ রেল যোগাযোগ চালু হয়। রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ১৯৩০ সালের মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। এসব কোয়ার্টারের প্রায় ৯০ শতাংশই বর্তমানে লালমনিরহাট পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, লালমনিরহাটে ৮৫০টিরও বেশি স্টাফ কোয়ার্টারের মধ্যে প্রায় ৪৫০টি অবৈধ দখলে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০০টি কোয়ার্টার জরাজীর্ণ হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৈধভাবে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৩০০টি কোয়ার্টার। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে অনেক ভবনের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্টোর পাড়া, ড্রাইভার পাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবু পাড়া, শিশুপার্ক ও সাহেব পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত এসব কোয়ার্টারের বড় অংশে বর্তমানে রেলকর্মীরা বসবাস করেন না। এখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে অবৈধ দখলদাররা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই বসবাস করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত ভবনগুলো আগাছায় ঢেকে গিয়ে মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের জমির কিছু অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ মাহমুদ ও বিএনপি কলোনির প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, পরিত্যক্ত রেল কোয়ার্টারগুলোতে মাদকসেবনসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু বরাদ্দপ্রাপ্ত কোয়ার্টার নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তদন্ত করে স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সেতু সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোকলেসুর রহমান আকাশ বাসসকে বলেন, শহরের বড় অংশের জমি রেলওয়ের মালিকানাধীন হওয়ায় পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর হোসেন বাসসকে বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী অব্যবহৃত রেলওয়ে জমি লিজ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান দখলকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পরিত্যক্ত রেল ভবন ও জমিতে মাদকসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাদ আহম্মেদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানে রেল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাটের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মো. তসলিম আহমেদ খান বাসসকে বলেন, রেলওয়ের জমি ও আবাসিক ভবন দখলমুক্ত করতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরাজীর্ণ কোয়ার্টার সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিত্যক্ত জমি উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিত্যক্ত রেল ভবন সংস্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং অব্যবহৃত জমির পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে জননিরাপত্তা বাড়বে, অপরাধ কমবে এবং লালমনিরহাটের নগর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।