বাসস
  ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:২৬

আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশার আলো ব্রি’র নতুন ধান ‘ব্রি ধান-১১৮’

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ২৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ‘ব্রি ধান-১১৮’ নামে স্বল্পমেয়াদি ও শৈত্য-সহনশীল নতুন একটি বোরো ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ জাতটি হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যাজনিত ফসলহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ উদ্ভাবিত এ জাতটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার কৃষকদের অন্যতম বড় সমস্যার সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এ অঞ্চলে আগাম বপন করলে শীতের কারণে ধানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, আর দেরিতে রোপণ করলে ফসল কাটার আগেই আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. খন্দকার মো. ইফতেখারউদ্দৌলা বলেন, 'ব্রি ধান-১১৮ বিশেষভাবে হাওরাঞ্চলের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে স্বল্প জীবনকাল এবং প্রজনন পর্যায়ে নিম্ন তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কৃষকরা আকস্মিক বন্যার আগেই ধান কাটতে পারবেন এবং শীতজনিত ‘চিটা’ পড়ার সমস্যাও অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে।'

ব্রির তথ্য অনুযায়ী, ধানের প্রজনন পর্যায়ে টানা সাত থেকে ১০ দিন গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলেও এ জাতটি তা সহ্য করতে পারে। এ সময় প্রচলিত অনেক জাতের ধানে ‘চিটা’ পড়ে, ফলে ধানের শীষে খালি দানা তৈরি হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

গবেষকদের মতে, স্বাভাবিক চাষাবাদে ‘ব্রি ধান-১১৮’ পরিপক্ব হতে ১৪৫ থেকে ১৫০ দিন সময় লাগে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোপণ করলে এপ্রিলের শুরুতেই ফসল কাটা সম্ভব হয়, যা হাওরাঞ্চলের বার্ষিক আকস্মিক বন্যার আগেই ফসল ঘরে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।

এ জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ দশমিক ৮ টন, যা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বোরো জাত ‘ব্রি ধান-২৮’-এর তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১ টন বেশি। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।

ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, হবিগঞ্জের প্রধান এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথি বিশ্বাস, যিনি ‘ব্রি ধান-১১৮’ উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেন, বলেন, কয়েক বছরের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে এ জাতটি হাওরাঞ্চলে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে।

তিনি বলেন, 'চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতটি অবমুক্ত হওয়ায় এখনো এটি ব্যাপকভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছেনি। তাই কৃষকদের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন।'

নতুন জাতটির দ্রুত সম্প্রসারণে আগামী বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের ৫০টি উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রি। প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০০টি করে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হবে।

ড. বিশ্বাস বলেন, 'আগামী বোরো মৌসুমে বৃহৎ পরিসরে প্রদর্শনী ও বীজ বিতরণের জন্য আমরা অফ-সিজন বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে মানসম্মত বীজ প্রস্তুত করছি।'

তিনি জানান, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগাম রোপণ করলে এ জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ টন হতে পারে। আর ১৫ থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে রোপণ করলে ফলন প্রায় ৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। বিদ্যমান অনেক স্বল্পমেয়াদি জাতের বিপরীতে ‘ব্রি ধান-১১৮’ নিম্ন তাপমাত্রাতেও দানার পূর্ণতা বজায় রাখতে সক্ষম, ফলে ‘চিটা’ পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

হাওরাঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষাপটে জাতটি অবমুক্ত করা হয়েছে। ড. পার্থ সারথি বিশ্বাস বলেন, 'হাওরাঞ্চল দেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ জোগান দেয়।'

তিনি আরও জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকার ইতোমধ্যে নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

নতুন প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্রি ২০২৬ সালের মে থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ মাসব্যাপী একটি সম্প্রসারণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ কর্মসূচির বাজেট ধরা হয়েছে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

এ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, ব্রির পাঁচটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩০ টন মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ এবং প্রায় তিন হাজার কৃষক ও ৪২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে আধুনিক চাষাবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন এলাকা। এ অঞ্চল থেকে দেশের মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ আসে।

ব্রির বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, ‘ব্রি ধান-১১৮’সহ জলবায়ু-সহিষ্ণু ধানের জাতগুলো ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করা গেলে হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে যেমন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে, তেমনি হাজার হাজার ঝুঁকিপূর্ণ কৃষক পরিবারের জীবিকাও উন্নত হবে।