বাসস
  ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০৪
আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৮

সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসায় সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিলবে ‘অ্যান্টিভেনম’

॥ বরুন কুমার দাশ ॥

ঢাকা, ১৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): বর্ষা মৌসুম এলেই দেশে সাপেকাটা রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই এই মৌসুমের কথা চিন্তা করে দেশের সব জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সরবরাহ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন সাপেকাটা রোগীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেই অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাবেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর মো. হালিমুর রশীদ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দেওয়া হয়। তাছাড়া চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ও বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সরবরাহ করা হয়েছে।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জমান জানান, ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত আছে।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বাসসকে বলেন, ‘সদর হাসপাতালসহ সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সাপেকাটা রোগী বেড়ে যায়। তাই আগে থেকেই অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাঠানো হয়েছে।’

এছাড়াও সাপেকাটা রোগীদের সঠিকভাবে সেবা দিতে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাঙ্গামাটি জেলা সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসাও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘সদর হাসপাতালসহ সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যথেষ্ট অ্যান্টিভেনম রয়েছে। সবাইকে বলব, কাউকে সাপে কাটলে ওঝা বা কবিরাজের কাছে যাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে বিনামূল্যে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দেওয়া হবে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সাপের ছোবলের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ২৫ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষ প্রবেশ করে। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষ অন্ধ ও চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাপেকাটার ঘটনা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়।

গবেষকরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে সকাল ও সন্ধ্যায় সাপে বেশি ছোবল দেয়। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। শীতকালে গোখরা সাপের দংশনের ঘটনা ঘটে। বর্ষাকালে অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাপেকাটা রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষকে সাপে কামড় দেয়। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জনের মৃত্যু হয়। সাপেকাটার ঘটনার মধ্যে এক-চতুর্থাংশ বিষাক্ত। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ শারীরিক ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক অক্ষমতা দেখা যায়। সাপের কামড়ের শিকারদের ৯৫ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলের এবং নারীদের তুলনায় পুরুষ ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি সাপের কামড়ের ঝুঁকিতে থাকে।

ফরাসি চিকিৎসক আলবার্ট কেলমেট কর্তৃক ১৮৯৫ সালে অ্যান্টিভেনম আবিষ্কার সাপে কাটা লাখ লাখ রোগীকে নতুন জীবনের দিশা দিয়েছে। কিন্তু কুসংস্কারের প্রভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাপেকাটা রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে না এসে স্বজনরা ওঝার কাছে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৯৪ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে ২৬টি প্রজাতি বিষধর। বাকি ৬৮ প্রজাতির সাপের বিষ নেই। এরা ছোবল দিলে কিছুই হয় না। বিষধর ১২ প্রজাতির সাপের অবস্থান সাগরে, বাকিগুলো গহীন জঙ্গলে এবং লোকালয়ে বাস করে।