শিরোনাম

/মনসুর আহম্মেদ/
রাঙ্গামাটি, ১১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : দীর্ঘ তিন মাস ১৫ দিন বন্ধ থাকার পর আবারো দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম লেক জেলার কাপ্তাই লেকে আজ থেকে মৎস্য আহরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে।
সোমবার মধ্যরাত থেকে জেলেরা মাছ শিকার শুরু করায় রাঙ্গামাটির বিএফডিসি’র ল্যান্ডিং ঘাটে মৎস্য ব্যবসায়ীসহ জেলেদের মাঝে ফিরেছে প্রাণ চাঞ্চল্য।
মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ দিতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে লেকে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ শিকারে নেমেছেন হাজারো জেলে।
জাল-নৌকা নিয়ে কাপ্তাই লেকে জেলেরা, দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরেছে জীবিকার গতি। এতে দীর্ঘদিন পর কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে লেকপাড়ে, স্বস্তি ফিরেছে জেলে পরিবারগুলোতেও। তবে কাঙ্খিত মাছ পাওয়ার ওপরই নির্ভর করছে তাদের এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে।
নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে কাপ্তাই লেক। ভোরের আলো ফুটতেই নৌকা নিয়ে লেকের বিভিন্ন এলাকায় ছুটছেন জেলেরা। কারও হাতে জাল, কারও নৌকায় মাছ ধরার সরঞ্জাম-আবারও জীবিকার সন্ধানে লেকের বুকে ছুটছেন তারা।
দীর্ঘ সময় মাছ শিকার বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নিয়ে অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরার সুযোগ পাওয়ায় তাদের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির ছাপ।
তবে মাছের উৎপাদন ও প্রজনন ধরে রাখতে নিয়ম মেনে মাছ আহরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য আহরণ শুরু হওয়ায় খুলে দেয়া হয়েছে জেলার সকল বরফ কল। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে রাঙ্গামাটির ৪ টি ল্যান্ডিং ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে।
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেকে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ কাপ্তাই লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশকে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গত ২৪ এপ্রিল দিবাগত মধ্যরাত থেকে মাছ শিকার নিষিদ্ধ করে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিন মাস ১৫ দিন পর সোমবার মধ্যরাত থেকে আবারো মাছ শিকার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে প্রশাসন থেকে মাছ শিকারের নিষিদ্ধের আদেশ তুলে নেয়ায় জেলেরা আবারো মাছ শিকার শুরু করে।
রাঙ্গামাটির মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল শুক্কুর বাসস’কে বলেন, দীর্ঘ ৩ মাস ১৫ দিন পর কাপ্তাই লেকে আবারো মাছ আহরণ শুরু হওয়ায় আমরা মৎস্য ব্যবসার সাথে জড়িত সকল ব্যবসায়ীসহ সকলে অত্যন্ত খুশি।
তিনি বলেন, এবার মাছের সাইজ একটু ছোট দেখা যাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝা যাবে কি রকম মাছ ধরা পড়ছে, মাছের সাইজ বড় হলে লাভের মুখ দেখবো।
রাঙ্গামাটি বিএফডিসি ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম বাসস’কে বলেন, কাপ্তাই লেকে তিন মাস মাছ শিকার বন্ধের পর মাছ আহরণ শুরু হওয়ায় রাঙ্গামাটির বিএফডিসি’র ল্যন্ডিং ঘাটে প্রথম দিনে প্রচুর পরিমাণ মাছ এসেছে এবং এবার সাইজ একটু ছোট হলেও আগামী কিছু দিনের মধ্যে মাছের আকার বড় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। রাঙ্গামাটি কাপ্তাই লেকে মাছের সুষ্ঠু প্রাকৃতিক প্রজনন, বংশ বিস্তারের কারণে মাছের উৎপাদন আগামী দিনের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটি বিএফডিসি’র ব্যবস্থাপক।

লেকের বিশাল জলরাশি রাঙ্গামাটির অর্থনীতি ও বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর কাপ্তাই লেকে মাছ শিকার শুরু হওয়ায় একদিকে যেমন জেলেদের জীবিকায় ফিরেছে স্বস্তি, অন্যদিকে মাছের উৎপাদন ও প্রজনন ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন নিয়ম মেনে মাছ আহরণ এবং কার্যকর নজরদারি। তাহলেই কাপ্তাই লেক হতে পারে জেলেদের টেকসই জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস।
স্থানীয়রা মনে করেন, কাপ্তাই লেক শুধু রাঙ্গামাটির অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস নয়, এটি পাহাড়ের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তাই লেককে বাঁচিয়ে রেখে মাছের উৎপাদন বাড়ানো এবং জেলেদের স্থায়ী জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের প্রত্যশা-সরকারি নজরদারি, জেলেদের সচেতনতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে কাপ্তাই লেক হয়ে উঠবে আরও সমৃদ্ধ মৎস্য ভাণ্ডার। আর এর সুফল পৌঁছাবে লেক পাড়ের হাজারো জেলে পরিবারের ঘরে।
প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ আহরণ বন্ধ রেখে প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরে নির্ধারিত নিয়ম মেনে মাছ শিকার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে এ মৎস্য সম্পদ টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘ তিন মাস ১৫ দিন পর আবারো পুরোদমে কাপ্তাই লেকে মৎস্য আহরণ শুরু হওয়ায় রাঙ্গামাটিসহ ৪টি মৎস্য ল্যন্ডিং ঘাটে ফিরেছে প্রাণ চাঞ্চল্য।