শিরোনাম

॥ মুহাম্মদ আমিনুল হক ॥
সুনামগঞ্জ, ১৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পাখির কলতান, আকাশে মেঘের মিতালি, জোস্না রাতে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে যেন আসমান ভাইঙ্গা জোস্না নামে। এটি হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ঘেষাঁ গ্রাম ‘ঝুঁমগাঁও’।
গ্রামের উত্তর পশ্চিমের বাঁশ বাগানের মাথার উপরে তাকালে দেখা মিলবে মেঘ পাহাড়ের দেশ মেঘালয় পাহাড়। আকাশে উড়ন্ত মেঘের সাথে পাহাড়ের মিতালি। আপনি হারিয়ে যাবেন আপন ভূবনে।
আজ কাল গ্রাম বাংলার মেঠোপথ, মাটির তৈরি বাড়ি খুব কমই মিলে। কিন্তু, সুনামগঞ্জের ঝুঁমগাঁওয়ে এইসবের দেখা মিলে। ফুল সুন্দরী ঝুমগাঁও,পরিস্কার-পরিচ্ছন এক আদিবাসী গ্রাম। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক গ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, এক সময় গ্রামটি ছিল বন্য প্রাণির অভয়াশ্রম। মানুষ আবাদ করে বসতি স্থাপন করে। গ্রামে প্রথমে হাজংরা বসবাস করতো। ১৯৭১ এর যুদ্ধের পর সমতলের মানুষ এসে হাজংদের নানা উপদ্রপ করতো। তাই হাজংরা গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যায়। তাদের জায়গায় ঘরবাড়ি তৈরি করে বাঙালিরা বসবাস করে। সমতলের মানুষ এখানে থাকতে চাইলেও বাঘ, হাতি, শুয়র, সাপসহ নানা পশুপাখি মোকাবেলা করে থাকতে পারেনি। তাই তারা আবারও সমতল ভূমিতে চলে যায়।
১৯৭৫ সালে মাত্র ৫টি গারো পরিবার এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। তারপর এক এক করে ৪৫টি পরিবার গ্রামে আসে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলায় অবস্থিত ঝুমগাঁও। বাংলাদেশ ভারতের জিরো পয়েন্টে আন্তর্জাতিক সীমানা ঘেঁষে ঝুমগাঁও বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আদিবাসী গ্রাম। ভূমি সমতল থেকে ১শ’ ফুট উচুঁতে গ্রামের অবস্থান। এখানে ৪০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে। ঝুমগাঁও গ্রামের নাম শুনে যে কারো চোখে ভেসে ওঠবে পাহাড়ের জনপদের আদিবাসীদের জুমচাষের কথা। কিন্তু, না ঝুমগাঁয়ে জুমচাষ হয় না। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, ভাঁজে ভাঁজে হয় না কোন শস্যের চাষবাস। গ্রামের নামের সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। সুনামগঞ্জ শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের মেঘালয় সীমান্তের গ্রাম ঝুমগাঁও। ভূমি সমতল থেকে একশ’ ফুট উঁচু সিঁড়ি মাড়িয়ে উপরে উঠলে ঝুমগাঁও গ্রামের প্রবেশদ্বারের দেখা মিলে।
গ্রামের উত্তর পশ্চিম অংশ জুড়ে রয়েছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, দক্ষিণ পূর্ব অংশে রয়েছে সমতল ধানক্ষেত। ভারতীয় সীমান্তের ১২৩০ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের পাশে মাটির ঘরের একটি অংশ বাংলাদেশে অন্য অংশ ভারতে অবস্থিত। গ্রামের প্রবেশ দ্বারের তিনটি সিঁড়ি পেরিয়ে দেখা মিলে ৯ ফুট প্রস্তের পাকা সড়ক।
সড়কের দুই পাশে লোহার রেলিংয়ের পাশে নানা রঙ্গের পাতাবাহার ও নাম না জানা ফুলের বেষ্টনির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করার মতো। পাহাড়ি জনপদে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘরের দেখা মিলবে ঝুঁমগাও গ্রামে। গ্রামের ৪০টি ঘরের মধ্যে ৩০টি ঘরের ছাদে ঢেউটিন ও চারপাশে মাটির দেয়াল বেষ্টিত।
৪শ’ মিটার দীর্ঘ ও ১শ’ মিটার প্রস্তের ঝুমগাঁও গ্রামের সড়কে রয়েছে রঙ বেরঙের ফুল পাতা ঘেরা বাগান। সড়কের দুই পাশে সারি সারি করে লাগানো রঙ বেরঙের ফুল পাতায় সজ্জিত গ্রামে রয়েছে অসংখ্য কাঁঠাল ও লেবু বাগান। শেষপ্রান্তে জিরো পয়েন্টের উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে মেঘালয়ের মেঘ। দিনরাতে কান পাতলেই শোনা যাবে ঝিঁঝিঁ পোকা ও পাখপাখালির ডাক। যতদূর চোখ যাবে তত দূরে নেই কোনো স্থানে ময়লা আবর্জনার চিহ্ন।
প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে ফুল ও ফলদ বৃক্ষের বাগান। নগরের নাগরিক যন্ত্রণা যানবাহনের কালো ধোয়া দূষিত বায়ু নেই। বিশুদ্ধ অক্সিজেন চিরসবুজ সতেজ মেঘালয়ের মনোমুগদ্ধকর প্রকৃতি লতাপাতা বৃক্ষরাজী শোভিত স্বাস্থ্যকর জনপদের নাম ঝুমগাঁও। অনেকের বসতঘরের বারান্দায় প্লাস্টিকের টবে রোপণ করেছেন নানা রঙের পাহাড়ি ফুলের চারাগাছ। বাড়ির আঙিনায় শোভা পাচ্ছে লেবু, জাম্বুরাসহ নানা সাইট্রাস্ট জাতীয় ফলের গাছ।
প্রতিটি বাড়ির পাশে রয়েছে কাঁঠাল বাগান। পূর্ব পশ্চিম ও মধ্যপাড়া মহল্লায় যেতে হলে পেরুতে হবে সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়েই উপরে উঠলে দেখা মিলবে আদিবাসী বসতির।
গ্রামের তরুণ মারাক বাসস’কে বলেন, এখানে ফুলের গাছ ছিলো না। গ্রামবাসী ফুলের চারা, পাতাবাহারি গাছের চারা লাগানো শুরু করেন। কারণ গ্রামটি দূর থেকে দেখতে সুন্দর।
রাস্তাঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। চমৎকার লোকেশন। গ্রামের মধ্যে দিয়ে সরু পাকা সড়কের দুই পাশের লোহার রেলিং। সব কিছু দেখে মনে হয় ফুলের বাগান করলে গ্রামের সৌন্দর্য্য আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই গ্রামবাসিকে বলে দেয়া হয় তারা যেন নিজেদের বাড়িতে ফুলের গাছ লাগান। এভাবেই পুরো গ্রাম হয়ে পড়ে ফুলের বাগান। এই গ্রাম দেখতে প্রতিদিন শতশত মানুষ আসেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মানুষের কষ্ট হয়।
লেভিং মারাক বলেন, আমাদের গ্রামে এখনো শত বছরের পুরোনো মাটির ঘর আছে। এসব ঘরে দিন ও রাতে আরামদায়ক বাতাস বয়ে যায়। এছাড়া প্রত্যেকের বাড়ির আঙ্গিনায় ফুল ফলের বাগান রয়েছে। আবার বারান্দার পাটের সিক্কার মধ্যে ফুলের টব বেঁধে রাখা হয়। যখন ফুল ফুটে তখন বাড়িটি অপরূপ সুন্দর হয়ে ওঠে।
শুকুমার মারাক বলেন, গ্রামের সব মানুষ স্বাবলম্বী নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই চেষ্টা করছে গ্রাম সুন্দর রাখতে। গ্রামবাসী নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা আবর্জনা ফেলে। পর্যটকরা যদি এভাবে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা আবর্জনা ফেলেন তাহলে পরিবেশের সৌন্দর্য্য নষ্ট হবে না।
বাংলাবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসাইন বাসস’কে বলেন, ছুটির দিনে পর্যটকের ঢল নামে। এছাড়া প্রতিদিন শতশত পর্যটক ঘুরতে আসেন। তাদের জন্য বসার জায়গা নেই, ওয়াশ রুম নেই, ভালো একটা রাস্তাও নেই। সরকার উদ্যোগ নিয়ে ঝুমগাঁও কে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে রাস্তাকে মোটামুটি চলার উপযোগী করে দিয়েছি।
দোয়ারাবাজার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা-অরূপ রতন সিংহ বাসস’কে বলেন-ঝুঁমগাঁও এর জন্য নতুন অর্থ বছরে প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। এখানে বিশুদ্ব পানির ব্যবস্থার জন্য জনস্বাস্থ্যকে বলা হয়েছে ‘কূয়া’ করার জন্য।
উপজাতিদের সংগঠন :
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি অর্পণ বিবরা জানান, ১৯৭১ সালে ৮-১০টি পরিবার বসতি স্থাপন করে। দেশ স্বাধীন হওযার পর আরো পরিবার এখানে আসতে শুরু করে।
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি লুইস সাংমা জানান, ১৯৭৫ সালে তিনি এখানে এসেছেন। তারপর আরও মানুষ আসতে শুরু করে। তবে, এখন পর্যন্ত গ্রামটি সূ-শৃঙ্খল পরিষ্কার পরিছন্ন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বাসস’কে বলেন, গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও পানির সমস্যা দূর করতে প্রশাসন কাজ করবে।