শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ১২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : চট্টগ্রাম বিভাগে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় আছে লাখো মানুষ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু এলাকা।
নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ জেলার ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এসব এলাকার বন্যার্তদের মাঝে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ জোরদার করা হয়েছে।
সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে দূর্গত এলাকার মানুষের কাছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যাজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার কাজ সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এসব কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।
তারা দুজনই বন্যাকবলিত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা পরিদর্শন করেন এবং সেখানে ত্রাণ বিতরণ করছেন বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
চট্টগ্রামের আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেনাসদস্যরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও ফটিকছড়ির দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় চাল, চিড়া, মুড়ি ও বিশুদ্ধ পানিসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন।

বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু ও আহত হয়েছেন ৩৯ জন। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই পাঁচ জেলার সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, এবারের দুর্যোগ সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসের অন্যতম ঘটনা।
এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ।
মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১১ জন, কক্সবাজারে ২৩ জন (এর মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা), রাঙামাটিতে তিন জন ও বান্দরবানে ছয় জন রয়েছেন।
আহত হয়েছেন মোট ৩৯ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১২ জন, কক্সবাজারে ২৪ জন, খাগড়াছড়িতে একজন এবং বান্দরবানে দুই জন।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে ৬ লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে।
দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ ও বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পাঁচ জেলায় মোট ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বন্যায় সরচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে উপজেলার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ৪ লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। প্রত্যেকের কাছে রান্না করা ও শুকনো খাবার পৌঁছে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো, সেখানে ত্রাণ পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহার করছেন। প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি।
পাশের বাঁশখালী উপজেলায়ও বন্যার পানি ১৪টি ইউনিয়নেই ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। টানা চারদিন ধরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও বাড়ছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলার প্রায় অর্ধেক এখনো পানির নিচে। এ পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, ১০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার ও ১০ হাজার জনের রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বন্যার্তদের হাতে ত্রাণ পৌঁছাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই, আনোয়ারা ও রাঙ্গুনিয়ার নিম্নাঞ্চলও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় সরকার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ জেলায় এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯০ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন জেলায় রান্না করা খাবার, শিশু খাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিনও বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ জেলাতেই পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা, দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আদিত্য ইসলাম অমিত।

পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা দুজনই বন্যাকবলিত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা পরিদর্শন করেন এবং সেখানে ত্রাণ বিতরণ করছেন। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলেও জানান দুই প্রতিমন্ত্রী।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা, বিদ্যুৎ ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।