শিরোনাম

\ বরুন কুমার দাশ \
ঢাকা, ১১ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পেসমেকার, ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (আইসিডি) ও কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি (সিআরটি) ডিভাইসের দাম সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিয়েছে সরকার।
এতে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। সরকারের এ সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তারা সব ধরনের চিকিৎসাসেবার ব্যয় আরও কমানোর দাবি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে।
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু কার্ডিয়াক ওয়ার্ড-২-এ গিয়ে দেখা যায়, মায়ের পাশে শুয়ে আছে আট মাস বয়সী আয়মান রহমান। তার মা তাহমিনার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জন্মের মাত্র দুই মাস পরই চিকিৎসকরা শিশুটির হৃদযন্ত্রে ছিদ্র শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই ওষুধ চলছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, আয়মানের বয়স এক থেকে দেড় বছর হলে অস্ত্রোপচার করাতে হবে।
হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইসের দাম কমানোয় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাহমিনা বাসস’কে বলেন, ‘ডিভাইসের দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ। ছেলের অপারেশনের বিপুল খরচ নিয়ে যে দুশ্চিন্তায় ছিলাম, এই সিদ্ধান্তে সেই ভয় অনেকটাই কমেছে। আমি চাই সরকার এভাবেই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াক এবং সব ধরনের চিকিৎসার খরচ কমিয়ে আনুক।’
নীলফামারীর জলঢাকা থেকে চিকিৎসা নিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছেন রবিউল ইসলাম। তিনি বাসস’কে বলেন, ‘গ্রাম থেকে অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসেছি। আমার মতো অনেকেই জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করান। সরকারের এই উদ্যোগে আমার মতো দরিদ্র রোগীরা উপকৃত হবেন। তবে সরকারের কাছে দাবি থাকবে, ওষুধের দামও যেন মানুষের হাতের নাগালে রাখা হয়।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গেইটে কথা হয় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হার্টের চিকিৎসার বিভিন্ন উপকরণ ও কিডনির ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর খবর শুনেছি। এটি আমাদের মতো প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অনেক বড় খুশির সংবাদ। বর্তমান সরকারের এ সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।’
সম্প্রতি সরকার হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পেসমেকার, ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (আইসিডি) এবং কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি (সিআরটি) ডিভাইসের দাম কমিয়েছে। গত এপ্রিলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এসব উপকরণের দাম সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, পেসমেকার, আইসিডি ও সিআরটি হৃদরোগ চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। পেসমেকার হৃৎস্পন্দন ধীর বা অনিয়মিত হলে তা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, আইসিডি হৃৎস্পন্দনের বিপজ্জনক অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে এবং প্রয়োজন হলে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। সিআরটি এমন একটি পদ্ধতি, যা হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা বা হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অংশের স্পন্দনের অসামঞ্জস্য দূর করে এর কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে হয়। এর মধ্যে শুধু হৃদরোগেই মৃত্যু হয় প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষের।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে হার্টের রিংয়ের বার্ষিক বাজার প্রায় ৩০০ কোটি টাকার। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ হাজার স্টেন্ট বা রিং পরানো করা হয়। এর মধ্যে শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেই ৯ হাজারের বেশি স্টেন্ট বসানো হয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ২৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪৪ ধরনের স্টেন্ট, পেসমেকার, বেলুন গাইডওয়্যার, ক্যাথেটার, ভালভ, অক্সিজেনেটরসহ হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মেডিকেল ডিভাইস আমদানি করে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (সিডিভিআরএ-৬০০০ নিউট্রিনো ভিআর)-এর দাম ৭ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দাম কমেছে প্রায় ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এছাড়া সিডিভিআরএ-৫০০কিউ গ্যালান্ট ভিআর-এর দাম ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং সিডিডিআরএ-৫০০কিউ গ্যালান্ট ডিআর-এর দাম ৯ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে।
একইভাবে সিডিএইচএফএ-৬০০কিউ নিউট্রিনো এইচএফ এবং সিডিএইচএফএ-৫০০কিউ গ্যালান্ট এইচএফ—উভয় ডিভাইসের দাম ১২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
এছাড়া এনডিউরিটি কোর ডিডিডিআর (ডুয়াল চেম্বার) পেসমেকারের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এনডিউরিটি এমআরআই ডিডিডিআর পেসমেকারের দাম ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অ্যাসিউরিটি এমআরআই ডিআর ডিডিডিআর পেসমেকারের দাম ৩ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে। এনডিউরিটি কোর ভিভিআইআর (সিঙ্গেল চেম্বার) পেসমেকারের দাম ১ লাখ ৪৫ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি (সিআরটি) ডিভাইসের দাম সামান্য বেড়ে ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মেডিকেল ডিভাইসের মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি), উৎপত্তির দেশ, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ডিএআর নম্বর সিলমোহর আকারে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে মেডিকেল ডিভাইস আমদানি ও বাজারজাতের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বাসস’কে বলেন, ‘হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণের পর পেসমেকারসহ অন্যান্য হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণের দামও কমানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য এসব চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে আরও সহনীয় হয়েছে।’