শিরোনাম

একেএম রাশেদ শাহরিয়ার
ঢাকা, ৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার| শাক-সবজি, চাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাদ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বাড়ানো হচ্ছে জনবল, স্থাপন করা হচ্ছে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাব) এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড| একই সঙ্গে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, গবেষণা, জনসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে| সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বিভিন্ন ¯^ল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে|
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান আইনের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার নির্ধারিত খাদ্যের গুণগত মান ও নির্দেশিকাকে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| যেসব খাদ্যের ক্ষেত্রে এখনো কোনো মানদণ্ড নেই, সেগুলোর জন্য নতুন করে মান ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে|
খাদ্যে দূষণ, রোগজীবাণু, সার, কীটনাশক ও বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ, পশু ও মৎস্যরোগের ওষুধের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, ফুড অ্যাডিটিভ, প্রিজারভেটিভ, মাইকোটক্সিন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং গ্রোথ প্রোমোটারের সহনীয় মাত্রা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্ধারণ বা হালনাগাদ করা হবে| যেসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে কোনো সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত নেই, সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নতুন মান নির্ধারণ করা হবে|
এছাড়া খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সনদের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা প্রণয়ন এবং খাদ্য পরীক্ষাগারগুলোর আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে| পরীক্ষাগারগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পরিবীক্ষণের পাশাপাশি কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হবে|
একই সঙ্গে আমদানি করা খাদ্যের মানদণ্ড ও পরীক্ষণ পদ্ধতি নির্ধারণ, মোড়কজাত খাদ্যের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগুণ-সংক্রান্ত দাবি প্রকাশের নীতিমালা প্রণয়ন, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে|
সূত্র জানায়, এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধনে সরকারকে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিএফএসএ| একই সঙ্গে খাদ্য গ্রহণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, ˆজবিক ঝুঁকি এবং খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ও বিস্তারের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও বিশ্লেষণের কাজও জোরদার করা হয়েছে|
সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্যের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য নিয়মিত পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে| নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমš^য় জোরদারে একটি শক্তিশালী কারিগরি সহযোগিতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজও চলছে|
দেশীয় খাদ্য এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করে আমদানি ও রপ্তানিকৃত খাদ্যের মানে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ| পাশাপাশি খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমš^য় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রবিধান প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে|
দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সচিব শ্রাবস্তী রায়|
তিনি বাসস’কে বলেন, একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই| সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আইন প্রণয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে| তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ দায়িত্ব পালনে সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে|
শ্রাবস্তী রায় বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে| এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদিত খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়|
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন খাদ্য বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে| একই সঙ্গে খাদ্য ব্যবসায়ী, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা এবং হোটেলকর্মীদের স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে|
খাদ্যের মান যাচাই ও ভেজাল শনাক্তে দেশের পরীক্ষাগার নেটওয়ার্কের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি| আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণে কাজ চলছে|
বিএফএসএ’র সচিব বলেন, খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে কেবল আইন প্রয়োগ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না| এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে|
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সু-স্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশ অনেকাংশে নিরাপদ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল| তাই ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও|
ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শ্রাবস্তী রায় বলেন, খাদ্য কেনা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে| কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভেজালের তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে| সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে বাংলাদেশকে শতভাগ নিরাপদ খাদ্যের দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে|
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, দেশব্যাপী নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে| এ লক্ষ্যে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল সম্প্রসারণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে|
তিনি বাসস’কে বলেন, বর্তমানে দেশের ৪৭টি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে| একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমš^য় করে নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে|
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে বিএফএসএ| এ জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে জনবল বৃদ্ধির কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে|
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে দেশজুড়ে নিয়মিত কর্মশালা, সেমিনার, মেলা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে| পাশাপাশি আধুনিক খাদ্য প্যাকেজিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুত খাদ্যের মান যাচাইয়ের জন্য মিনি ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে|
তিনি বলেন, ক্ষতিকর ট্যানারি বর্জ্যের প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে| পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে আরও শক্তিশালী করতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে|
বিএফএসএর চেয়ারম্যান বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না| বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমšি^ত ব্যবহারের মাধ্যমেই টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব|
তিনি জানান, নরসিংদী ও গাজীপুরে কিছু শিশুর শরীরে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে| এর উৎস ও কারণ অনুসন্ধান এবং কার্যকর প্রতিকার নির্ধারণে বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর সঙ্গে যৌথভাবে বিশেষ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে|
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে| ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন|
জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড হালনাগাদ, গবেষণা জোরদার, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার| সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে|