শিরোনাম

॥মোশতাক আহমদ॥
ঢাকা, ৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দেশে শীতকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বাড়াতে এবং কৃষকদের সহায়তায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় দেশের ২০টি জেলার ৮ হাজার ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মাঝারি কৃষককে বিনামূল্যে পেঁয়াজ বীজ (কন্দ), সার, সংরক্ষণ পাত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হবে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপকরণ-২ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিটি কৃষককে ২০ শতক জমিতে শীতকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে- ১৬০ কেজি পেঁয়াজ বীজ (কন্দ), ২০ কেজি ডিএপি সার, ২০ কেজি এমওপি সার ও একটি বীজ সংরক্ষণ পাত্র। এছাড়া পরিচর্যা ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য নগদ আর্থিক সাহায্যও পাবেন তারা। সব মিলিয়ে প্রতি কৃষকের পেছনে সরকারের ব্যয় হবে ১১ হাজার ৮২৫ টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই কর্মসূচির আওতায় সবচেয়ে বেশি উপকারভোগী নির্বাচিত হয়েছেন রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলায়। এই দুই জেলার প্রতিটি থেকে ১ হাজার কৃষক এই সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে ৯০০ জন, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে ৬০০ জন করে, বগুড়ায় ৫০০ জন, মাদারীপুরে ৪০০ জন এবং মানিকগঞ্জ ও পঞ্চগড়ে ৩০০ জন করে কৃষক এই প্রণোদনা পাবেন।
অন্যদিকে গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরসহ বাকি জেলাগুলোর প্রতিটিতে ২০০ জন নির্বাচিত কৃষক এ সুবিধা পাবেন।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, বরাদ্দকৃত এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। কোনোভাবেই নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করা যাবে না। জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দেবে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
উপকারভোগী কৃষক নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি গত বছরের পেঁয়াজ চাষের তথ্য ও চলতি মৌসুমের উৎপাদন সম্ভাবনা বিবেচনা করে উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করবে। এরপর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের তালিকা তৈরি করবেন, যা উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির অনুমোদনের পর চূড়ান্ত হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সুবিধাভোগী কৃষকদের তথ্য ‘কৃষক তথ্য ছক’-এ যুক্ত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ে পাঠাতে হবে। কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, জমির অবস্থান ও প্রাপ্ত উপকরণের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।
প্রণোদনার উপকরণ বিতরণে কৃষক কার্ডধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উপকরণ নেওয়ার সময় কৃষকের স্বাক্ষর বা টিপসইসহ মাস্টাররোল সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তালিকাভুক্ত কৃষক ছাড়া অন্য কাউকে কোনো উপকরণ বা টাকা দেওয়া যাবে না।
কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ৫ জন কৃষককে একটি গ্রুপ বা দল হিসেবে বিবেচনা করে ডিএপি ও এমওপি সার বিতরণ করা হবে। স্থানীয় পরিবেশ ও উপযোগিতার ভিত্তিতে অধিক ফলনশীল জাতের পেঁয়াজ কন্দ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), স্থানীয় বীজ উদ্যোক্তা বা অনুমোদিত বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। বিতরণযোগ্য বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, বিশুদ্ধতা ও উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সার সংগ্রহ করতে হবে বিসিআইসি’র কারখানা, বাফার গুদাম, বিক্রয়কেন্দ্র বা বিএডিসি’র নিকটস্থ গুদাম থেকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করা উপকরণের সব হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে এবং ওয়েবসাইটে উপকারভোগীদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, এই প্রণোদনার মাধ্যমে দেশে মানসম্মত শীতকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বাড়বে, কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং ভবিষ্যতে পেঁয়াজ বীজ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
একই সঙ্গে এটি কৃষকদের আয় বাড়াতে ও কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই কর্মসূচির সার্বিক বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করবে। ফসল কাটার ১০ কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষকে দায় বহন করতে হবে বলেও সরকারি নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে সবসময় কৃষকদের পাশে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষকদের সহায়তায় এই পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে এটি ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আমরা আশা করছি।’