বাসস
  ০৮ জুন ২০২৬, ১১:১২
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০৭

হাবিপ্রবি’র গবেষণায় ব্যাগিং পদ্ধতিতে লিচুর ক্ষতিরোধ সম্ভব

দিনাজপুরে ব্যাগিং পদ্ধতিতে লিচু উৎপাদন। ছবি: বাসস

॥ রুস্তম আলী মন্ডল ॥

দিনাজপুর, ৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-হাবিপ্রবি’র গবেষণায় পরিবেশ বান্ধব লিচুর ফলছেদক পোকা দমনে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে লিচুর উৎপাদন ও ক্ষতিরোধে সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। আম এবং পেয়ারার মতো এবার ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে লিচু উৎপাদনে বাগান মালিকরা ভাল ফলাফল পাচ্ছেন।

হাবিপ্রবি’র জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. খাদেমুল ইসলাম গতকাল রোববার প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাসস’কে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, হাবিপ্রবি’র কৃষি অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম তার গবেষণায় লিচুর জন্য ক্ষতিকর ফলছেদক পোকা আক্রমণ রোধে ভালো ও অধিক ফলন পেতে ব্যাগিং পদ্ধতি আবিষ্কারে গত দু’বছর ধরে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছেন।

চলতি বছর লিচু মৌসুমে জেলার সদর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী দু’টি উপজেলাতে এই ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে সফলভাবে পোকা দমন করা সম্ভব হয়েছে। সেই সাথে ভালো ও অধিক লিচুর ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত দু’বছর হাবিপ্রবি’র গবেষণা ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে সদর উপজেলার হাবিপ্রবি’র পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাগানে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে সফলতা অর্জিত হয়েছে।

চলতি বছর সদর উপজেলাসহ পার্শ্ববতী চিরিরবন্দর ও ফুলবাড়ী উপজেলার বেশ কয়েকটি লিচু বাগানে হাবিপ্রবি’র গবেষণা বিভাগের উদ্যোগ ও পরামর্শে লিচু বাগানে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে পোকা দমন রোধসহ ভাল ও অধিক লিচুর ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে। আগামী বছর এই ব্যাগিং প্রদ্ধতি ব্যবহারে লিচুর ক্ষতি সাধন রোধে কৃষি বিভাগের সহায়তায় ব্যাপকভাবে লিচু বাগানে ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে গবেষকদের পক্ষ হতে আশ্বস্ত করা হয়।

সূত্র জানায়, এই পদ্ধতিতে মৌসুমের শুরুতে লিচু গাছের সবুজ পাতার মাঝে মাঝে কমলা, হলুদ, নীল, সাদাসহ রং বেরংয়ের ব্যাগ দিয়ে ফল ঢেকে ঝুলানো হয়। মূলত লিচু ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ রোধ করতে রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ব্যাগের ব্যবহার করছেন গবেষকরা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লিচুর ফলছেদক পোকা লিচু ফ্রুট বোরার আক্রমণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি লিচু নষ্ট হয়ে যায়। 

অধ্যাপক ড. আবদুল আলীম গত কয়েক বছর ধরেই বিষমুক্ত লিচু উৎপাদনের জন্য লিচুর পোকা রোধে গবেষণা করছেন। তিনি ব্যাগিং, বায়োপেস্টিসাইড ও ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক গত দু’বছর লিচুর পোকা রোধ দমনে সফল হয়েছেন।

ড. আলীম বলেছেন, এই পদ্ধতি ব্যবহারে লিচু গাছে মুকুল থেকে গুটি বের হওয়ার পর পরই একটি ব্যাগ দিয়ে ৩০ থেকে ৪৫টি করে লিচু ঢেকে দেয়া হয়। ফলে ক্ষতিকর এ পোকা লিচুতে আক্রমণ করার সুযোগ পায় না। ব্যাগের মধ্য দিয়ে আলো এবং বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকায় লিচু বৃদ্ধিতে ব্যাগের কোনো প্রভাব নেই বললেই চলে।

পাশাপাশি লিচু ঢেকে রাখায় বাদুড় কিংবা অন্য কোনো পোকার আক্রমণ থেকে লিচু রক্ষা পায়। অন্য দিকে ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাই নাশকের পরিবর্তে বায়োপেস্টিসাইড ও ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার করায় লিচু সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত হয়। ফলে ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের বংশ বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হয়।

ড. আবদুল আলীম আরো বলেছেন, লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকা লিচুর একটি মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা। এ পোকা থেকে বাঁচতে কৃষকরা বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করছেন। এসব কীটনাশক মানব দেহের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকির কারণ। এসব ক্ষতিকর পদার্থ থেকে বাঁচতে আমরা রাসায়নিক ব্যবহারের পরিবর্তে, পেনিকেল ব্যাগিং পদ্ধতি, বায়োপেস্টিসাইড এবং ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার করে লিচুর ক্ষতিকর ফল ছেদক পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য গবেষণা করছি।

গত দু’বছর এই গবেষণায় কিছু বাগানে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করে তিনি বলেছেন, ‘গত বছর আমরা এই পদ্ধতি ব্যবহারে লিচুর ফল ছেদক পোকা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছি।

অনেক সময় লিচু ঢেকে রাখার ফলে রং নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের এ পদ্ধতি ব্যবহারে লিচুর রং আমরা খুব সুন্দর পেয়েছি। পাশাপাশি উৎপাদিত লিচুর ফলন পেয়েছি প্রত্যাশা অনুযায়ী। আমরা আশা করছি, এই প্রকল্প শেষে লিচুর ক্ষতি কারক ফলছেদক পোকা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ভালো প্রযুক্তি আমরা কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে পারবো।’

তিনি জানান, চলতি বছর লিচুর মৌসুমে অনেক লিচু বাগানের মালিককে এই পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী করতে সফল হয়েছেন। আগামী বছর আরও অধিক সংখ্যাক নিচু বাগানের মালিক এই প্রদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, আগামীতে লিচুতে পোকা-মাকড় প্রতিরোধে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে ব্যাপকভাবে সফল হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। এখন ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষি বিভাগের প্রচারণার মাধ্যমে বাগান মালিকদের শতভাগ আগ্রহ সৃষ্টি করতে কৃষি বিভাগকে কাজ করতে যুক্ত করা হচ্ছে। এভাবে সমগ্র দেশে বিষমুক্ত লিচু ভোক্তাদের নিকট  বাজারজাত করা সম্ভব হবে। ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে নিরাপদ ও বিষমুক্ত লিচু খেতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন।