শিরোনাম

॥ রোস্তম আলী মন্ডল ॥
দিনাজপুর, ৬ জুন ২০২৬ (বাসস): জেলার নারী শ্রমিকদের নিখুঁত হাতে তৈরি সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার পাঁপড় এক সময় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি শুরু করা হয়েছিল।
দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী এই মুখরোচক পাঁপড় তৈরির কাপাঁপড় তৈরির জন্য খ্যাত শহরের চকবাজার এলাকায় গিয়েজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় এই এলাকার পাঁপড় বিশ্বখ্যাত। তবে উদ্যোগ ও পুঁজির অভাবে সে ঐতিহ্য এখন অনেকটাই হারাতে বসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাদেশে এখনও দিনাজপুরে তৈরি পাঁপড় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মুগ, খেসারি ও বেসনের তৈরি পাঁপড়ের কথা শুনলেই ভোজন রসিকদের জিভে পানি এসে যায়।
জনশ্রুতি রয়েছে, সুস্বাদু আর মুখরোচক হওয়ায় এক সময় এর চাহিদা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে। রাজা-বাদশাদের খাদ্য তালিকায় এই সুস্বাদু পাঁপড় রাখা হতো। দিনাজপুরে এই পাঁপড় তৈরির সাথে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় কয়েক শত বছরের ইতিহাস।
দিনাজপুরের লেখক সাহিত্যিক আজাহারুল আজাদ জুয়েল বাসসকে বলেন, দিনাজপুর শহরে অবস্থিত সেই স্মৃতিময় পুরোনো ঝাঁকড়া বটগাছের নিচে বসা ছোট ছোট দোকানে ভাজা হতো মুগের পাঁপড়। ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া হতো হালকা ঝালযুক্ত বিট লবণ। পুরো বছর জেলার গ্রাম গঞ্জের প্রায় প্রতিটি হাট-বাজারে পাঁপড় পাওয়া যায়। মেলাগুলো যেন পাঁপড়ের দোকান ছাড়া জমেই না।
দিনাজপুরে ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের কাছে বাহারি আর বিভিন্ন আকারের পাঁপড় তৈরির দৃশ্য অতি-পরিচিত। এক সময় কোথাও ঘুরতে যাওয়া, কিংবা স্কুলের টিফিনে বড় একখানা পাঁপড় কিনে তা অল্প অল্প করে অতি সাবধানে ভেঙে খাওয়ার দৃশ্য এখনো চোখে পড়বে। সরু সুগন্ধি চাল, লিচু আর কাটারি ভোগ চালের চিড়ার পাশাপাশি দিনাজপুরের পাঁপড়ের চাহিদা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে রয়েছে।
দিনাজপুর শহরের চকবাজার, নতুনপাড়া, মালদহ পট্টি বাসুনিয়াপট্টি, চুড়িপট্টি, রাজবাড়ি, গুঞ্জাবাড়ি, ফকিরপাড়া, বড়বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় এই মুখরোচক পাঁপড়। সাধারণত মসুর, ছোলা, মাষকলাই, চাল, আলু ইত্যাদির গুঁড়ো ও খামি থেকে এটি বানানো হয়। তবে দিনাজপুরের মুগ ও খেসারির ডাল এবং বেসনের পাঁপড় বেশ বিখ্যাত। সারাদেশের নিরামিষ ভোজিদের মধ্যে মুগ ডালের পাঁপড়ের চাহিদা ব্যাপক। মূল উপাদান ডাল হলেও পাঁপড়ের স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে খামিরের সাথে জিরা, মরিচ, বাদাম কিংবা কালিজিরা মেশানো হয়।
দক্ষিণ ভারতের এই খাবার দিনাজপুরে কি ভাবে প্রচলিত হলো, তা নিয়ে বিভিন্ন গল্প শোনা যায় লোক মুখে। এটাও জানা যায়, দিনাজপুরের রাজপরিবারের খাদ্য তালিকায়ও ছিল মুগের পাঁপড়। ফলে এই অঞ্চলে পাঁপড়ের ইতিহাস যে কয়েকশ বছরের পুরোনো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
পাঁপড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা গেলেও, এখন পাঁপড় মুখরোচক নাশতার অন্যতম অনুষঙ্গ। গরম বা শীতের দিন, বিকেলে চায়ের সঙ্গে পাঁপড় ভাজা, কিংবা পাঁপড় ভেঙে দিয়ে মুড়িমাখা অথবা শুধু ভাজা পাঁপড় খাওয়া এক অন্য আবেশ তৈরি করে।
দিনাজপুরের পাঁপড় এখন ঢাকাসহ সারাদেশে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সুপার স্টোরে তো বটেই, বড় মুদি দোকানে কেজি হিসেবে বিক্রি হয় পাঁপড়।
পাঁপড় তৈরির কাজে নিয়োজিত চকবাজার এলাকার নারী শ্রমিক নেত্রী শেফালী রানী বাসসকে বলেন, ‘সংসারের কাজের পাশাপাশি প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে পাঁপড় তৈরির কাজ করি। বাড়ির কাজ শেষে, নিজ বাড়িতেই দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকার পাঁপড় ডলতে পারি।’
তিনি স্বাস্থ্যসম্মত পাঁপড় তৈরির সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, ‘পাঁপড় তৈরির পর রোদে শুকাতে খুব কষ্ট হয়। খোলা জায়গায় পাঁপড় শুকাতে হয়। অনেক সময় ধুলাবালি এবং মাছি বসে। আবার বৃষ্টি হলে আমরা বিপদে পড়ে যাই। পাঁপড় তৈরির জন্য যদি কারখানা থাকত তাহলে পাঁপড় শ্রমিকেরা স্বচ্ছন্দে পাঁপড় বানাতে পারতো। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসম্মত পাঁপড় সরবরাহ করা সহজ হতো।’
পাঁপড় শ্রমিক হাছনা বানু বলেন, ‘১০ বছরের বেশি সময় ধরে পাঁপড় তৈরির কাজ করে আসছি। আগে ১০০ পাঁপড় ডললে ১০ টাকা দিতেন ব্যবসায়ীরা। এখন ১০০ পাঁপড় ডললে ৩০ টাকা দেন। কিন্তু তাতেও আমাদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়তি। তাই আমাদের পাঁপড় শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা সারাদিন কাজ করলে দিনে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করতে পারি।
দিনাজপুরের চকবাজার এলাকার পাঁপড় ব্যবসায়ী মো. নুরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, চকবাজার এলাকায় জেলার সবচেয়ে বেশি পাঁপড় তৈরি হয়। আমরা প্রায় ৩০ জন পাঁপড় ব্যবসায়ী সারাদেশে পাঁপড় সরবরাহ করে থাকি। পাঁপড় বিদেশে রপ্তানিরও চেষ্টা করেছিলাম। বিগত সময়ে সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, দিনাজপুরে পাঁপড় তৈরির সাথে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে এ অঞ্চলের সুস্বাদু পাঁপড় দেশের বাইরে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
পাঁপড় কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাঁপড় তৈরির মূল কাঁচামাল মুগ, খেসারি, বেসন, সয়াবিন ও পাম অয়েল। কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তা হয়ে উঠে, দৃষ্টি-নন্দন ও মুখরোচক। পাঁপড় তৈরি করা হয় উন্নতমানের চাল ও ডালের মিহি গুঁড়া কিংবা ময়দা দিয়ে।
প্রথমে সম-পরিমাণ মুগ ও মাষকলাই একসাথে মিশিয়ে মেশিনের মাধ্যমে ভেঙে গুঁড়া করা হয়। ফুটানো পানির সঙ্গে লবণ, জিরা, কালিজিরা, গোলমরিচ গুঁড়া, দই, সোডা, হিং ও আমচুর দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এর সাথে মুগ ও মাষকলাই ডালের মিহি গুঁড়া ও ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট রোলিং করে পাঁপড় তৈরির উপযুক্ত মণ্ড তৈরি করা হয়। মণ্ডটি লম্বালম্বি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সুতা দিয়ে কেটে নেওয়া হয়। গোলাকৃতির মসৃণ কাঠের পিঁড়িতে বেলোনচাপ দেওয়া হয়। এভাবে কয়েকবার এপিঠ-ওপিঠ করলে পাঁপড় তৈরি হয়। এগুলো ২০ থেকে ২৫ মিনিট কড়া রোদে ও পরবর্তী সময়ে সারাদিন হালকা রোদে শুকানো হয়।
পাঁপড় ব্যবসায়ী রিয়াজুল হক জানান, ‘বর্তমানে মুগের পাঁপড় প্রতি কেজি ২০৯ থেকে ২৫০ টাকা এবং মাষকলাই এবং অন্যান্য ডালের পাঁপড় ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। ঢাকায় এর দাম কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করা হয়।’
দিনাজপুর চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, এই জেলার সুস্বাদু বেদানা লিচু জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি দিনাজপুরের প্রস্তুত করা সুস্বাদু পাঁপড় মান-সম্পন্ন মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ জন্য আমরা ব্যবসায়ীরা উদ্যোগ নিয়েছি, পাঁপড় ব্যবসার সাথে যারা জড়িত, তাদের স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে পাঁপড় তৈরি ও বাজারজাত করার জন্য। আগামীতে বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় এখানকার পাঁপড় যাতে দেশের বাইরে রপ্তানি হয়, সে সফলতা অর্জন করতে চাই।