বাসস
  ২৬ জুন ২০২৬, ১৪:১৭

খুলনাঞ্চলে শতাধিক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ, স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস পাউবোর

ছবি: বাসস

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান 

খুলনা, ২৬ জুন ২০২৬ (বাসস) : নদীর তীব্র স্রোত, জোয়ারের চাপ এবং বৈরি আবহাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের শতাধিক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার বাঁধে কোথাও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাঁটল, কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাঁধের অংশ। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ জনপদ এমন আশঙ্কায়  দিন কাটছে উপকূলের বাসিন্দাদের।  

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)র তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। খুলনার পাশাপাশি বাগেরহাটের শরনখোলা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই দুই জেলায় আরও ৬০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীর তীরে এখন আতঙ্কই যেন নিত্যসঙ্গী। নদীর পাড় ঘেঁষে ভাঙছে বেড়িবাঁধ। বর্ষার ঢেউ আর জোয়ারের চাপে প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকি। 

স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, গত পাঁচ বছরে তিন দফা নদীভাঙনে তিনি হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মুখে তার পরিবার। 

তিনি বলেন, ‘আগের ভাঙনে সব হারাইছি। অনেক কষ্টে আবার ঘর তুলছি। এখন আবার বাঁধ ভাঙতেছে। রাত হলেই ভয় লাগে, কখন কী হয়।’

শুধু পানখালী নয়, দাকোপ উপজেলার জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষীখোলা ও নলডাঙ্গাসহ অন্তত ১০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া পাইকগাছার দেলুটি ও লতা ইউনিয়ন, কয়রার মহেশ্বরীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, ‘জোয়ারের সময় ঘুম আসে না। বাঁধ ভেঙে গেলে ঘের, জমি, বাড়িঘর সব শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রায়ই রাত জেগে বাঁধের অবস্থা দেখতে হয়।’

একই শঙ্কার কথা জানালেন পানখালীর আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আইলা আর আম্পানের সময় যা কষ্ট হইছে, তা এখনো ভুলতে পারি না। আকাশে মেঘ দেখলেই ভয় লাগে।’

স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর একই স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সাময়িক মেরামতের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী বর্ষায় আবারও দেখা দেয় একই সমস্যা। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমই তাদের কাছে নতুন দুর্যোগের বার্তা নিয়ে আসে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পাউবো। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় তাদের আওতায় প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর একটি বড় অংশ নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। 

স্থানীয়রা বলছেন, বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটি বা ইটের কাঠামো ভাঙে না, ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা আর নিরাপত্তাও। তাই সাময়িক সংস্কারের গন্ডি পেরিয়ে উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি টেকসই, কার্যকর ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দুর্ভোগ থেকে স্থায়ী মুক্তি। 

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।