শিরোনাম

/রুস্তম আলী মন্ডল/
দিনাজপুর, ১৬ মে,২০২৬ (বাসস) : জেলায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে কোরবানি পশু বিক্রির জন্য পশুর হাটগুলো জমে উঠতে শুরু করেছে। জেলায় ৬২ হাজার ৪০৮ জন খামারিসহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৩টি গবাদি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
খামারিরা জেলার ১৩টি উপজেলায় ৬৮টি পশুর হাটে কোরবানির পশু বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে আসা শুরু করেছে। বাহির থেকেও পাইকাররা হাটগুলোতে পশু ক্রয় করতে আসতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার জেলার বিরামপুর পুরাতন বাজার বৃহত্তম কোরবানির পশু হাটে বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু হাটে উঠেছিল। বাইরে থেকে আগত পাইকাররা তাদের পছন্দ মতো আগাম পশু ক্রয় করে নিয়ে গেছে বলে ওই হাটের ইজারাদার মো. আজমল হক বাসস’কে নিশ্চিত করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার দিনাজপুর জেলার সর্ববৃহৎ হাট চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর, ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ, পাবর্তীপুর উপজেলার আমবাড়ী এবং কাহারোল পশু বিক্রির এই চারটি বড় হাট বসেছিল। তবে হাটে বাহির থেকে আসা পাইকারদের যথেষ্ট আনাগোনা ছিল।
আগত পাইকাররা এসব হাট থেকে আগাম ভালো মাপের পশু ক্রয় করে নিয়ে গেছে বলে হার্টের ইজারাদাররা নিশ্চিত করেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত কোরবানি দাতাদের হাটে পশু ক্রয় করার জন্য তেমন আগমন ছিল না।
পবিত্র ঈদুল আযহার চাঁদ দেখার পর কোরবানি দাতারা তাদের পছন্দের পশু ক্রয় করতে হাটে আসবেন এবং পছন্দ অনুযায়ী পশু ক্রয় করে নিয়ে যাবেন। এ ধরনের রেওয়াজ বিগত বছর গুলোতে হয়ে আসছে বলে হার্টের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়। তবে পশু বিক্রির হাট গুলোতে বেচাকেনা এখন পযন্ত জমে উঠেনি। এবারে গত বছরের তুলনায় কোরবানির পশু বিক্রির সংখ্যা অনেক বেশি মজুূত রয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফলে এবারে কোরবানির পশুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায় সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন।
এবারে আগত পাইকাররা বলেছেন, কোরবানিদাতা ক্রেতাদের নিকট বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। লক্ষ টাকার দামের মধ্যে কোরবানির গরু খুঁজছেন হাটে আসা ক্রেতারা।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা বাসস’কে জানান, কোরবানির পশুর হাট গুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জাল টাকায় কোনো ধরনের কোরবানির পশু হাটে বেচাকেনায় যাতে না হয়, সেজন্য হাটগুলোতে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া হাট গুলোয় গরুর সুস্থতা যাচাইয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করছেন। জাল নোট পরীক্ষার জন্য নিয়োজিত আছে ব্যাংকের প্রতিনিধিরা। প্রত্যেকটি হাটে টাকা যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট বুথ স্থাপনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এ বছর কোরবানির পশুর দাম কিছুটা কম বলে জানান ক্রেতারা। অপর দিকে গো-খাদ্যের যে দাম তাতে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়বে এই আশঙ্কা করছেন পশু পালন করা খামারিরা।
বিক্রেতারা বলেছেন, হাটে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। বড় গরু কেউ কিনতে চাইছেন না। বড় আকারের গরুর ক্রেতা কম থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা। এছাড়া হাট গুলোতে গরুর সরবরাহ বেশি হওযায় খরচের তুলনায় তেমন দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন খামারিরা।
ক্রেতারা বলেছেন, ‘ঈদের এখনও অনেক কয়েক দিন বাকি রয়েছে। এখন গরু কিনলে বাড়িতে রেখে লালন-পালন করা কষ্টসাধ্য হবে। তাই ঈদের দু’-এক দিন আগে গরু কিনলে রাখা নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হবে না। ফলে শেষের দিকে গরু কেনার অপেক্ষায় আছেন তারা। তবে গত বারের চেয়ে গরুর দাম কম রয়েছে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর আমবাড়ী হাটে গরু নিয়ে আসা খামারি হারেস আলী বলেন, তিনি শাহীওয়াল জাতের ৫টি ষাঁড় নিয়ে এসেছেন। দাম হাঁকাচ্ছেন প্রতিটি আড়াই লাখ টাকা করে। কিন্তু ক্রেতারা দাম বলছেন দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার মধ্যে। গত বছর একই রকম গরু বিক্রি করেছেন ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অথচ এবার পশু খাদ্যের দাম অনেক বেশি। শেষ পর্যন্ত গরু ভাল দামে বিক্রি করতে পারবে সেটি খামারিরা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
আরেক বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি মাঝারি ৪ দেশি ষাঁড় বাড়িতে লালন-পালন করেছেন। একেকটি ষাঁড় লালন-পালন করতে তার খরচ হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকারও বেশি। কিন্তু ক্রেতারা দাম বলছে ৯০ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। তাই তিনি হাট থেকে গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যদি সামনের হাট গুলোতে দাম বাড়ে সেই আশা করছেন।
খামারি আব্দুর বাছেদ বলেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু লালন-পালনে এবার গরু প্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় দাম মিলছে না। এবার এখনও ঢাকার বেপারীরা আসতে শুরু করেনি। স্থানীয়রা হাটে এসে গরুর দামের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। কেনা বেচা এখনও জমেনি। দেখি সামনের হাটগুলোতে কী অবস্থা হয়।
ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে গরু কিনতে আসা আতোয়ার হোসেন বলেন, বাজারে অনেক দেশি গুরু উঠেছে। আজ হাটে এসে দাম যাচাই করছি। বিক্রেতারা দাম হাঁকাচ্ছে। আমরাও দাম বলছি। তবে মনে হচ্ছে গরুর দাম এখন পর্যন্ত গতবারের তুলনায় আকারভেদে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম জানান, জেলায় ষাঁড়, বলদ ও গাভী মিলে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৬টি গরু, ২৪৮টি মহিষ, ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯০টি ছাগল, ১৩ হাজার ৭২৯টি ভেড়া ও দুম্বা ২১টি কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এই জেলার চাহিদার দ্বিগুণের বেশি পশু এবারে কোরবানির জন্য মজুত রয়েছে।
তিনি বলেন, জেলায় ৬২ হাজার ৪০৮ জন খামারিসহ বিভিন্ন বাসা বাড়িতে এই গরুগুলো লালন-পালন করা হয়েছে। জেলায় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। ‘সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু লালন-পালনে খামারিদের উৎসাহিত করা হয়েছে।’
তিনি জানান, জেলার হাট গুলোয় কেউ যেন গবাদি পশুর ওপর অতিরিক্ত খাজনা আদায় করতে না পারে, এর জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলমান রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনও হাটগুলোতে নজরদারি রাখছে। জাল টাকা রোধে ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও হাটে রয়েছে। রুগ্ন পশু যাতে বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগ সন্দেহজনক পশুগুলো পরীক্ষার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।