শিরোনাম

॥ মো. মঞ্জুর মোর্শেদ ॥
মুন্সীগঞ্জ, ১৬ মে, ২০২৬ (বাসস) : মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ২শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী কোরবানির ধবল (সাদা) গরু এখনো তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
জেলার সদর উপজেলার মিরকাদিমের ধবল গরুর কদর এখনো দেশজুড়ে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অভিজাত এবং সৌখিন ক্রেতাদের নিকট ধবল গরুর চাহিদা বেশি। তাদের কোরবানির প্রথম পছন্দের পশু ধবল গরু। বংশ পরম্পরায় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পুরান ঢাকার ক্রেতারা এখনো ধবল গরু কোরবানি দেয়ার অপেক্ষায় থাকেন। পুরনো ঢাকার অনেক ক্রেতারা ঈদের অনেক আগে থেকেই মিরকাদিমে এসে পছন্দের গরুটি বায়না করে যান। সময়মতো তা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। ঢাকার রহমতগঞ্জের গণি মিয়ার হাটে পাওয়া যায় পায়ের খুড় হতে শুরু করে সকল অঙ্গ সাদা বর্ণের বিশেষ বৈশিষ্ট সম্পন্ন মিরকাদিমের ধবল গরু।
মুন্সীগঞ্জের ধবল গরুর বিশেষ চাহিদা থাকায় ১৯৩৩ সাল থেকে গণি মিয়া হাট কর্তৃপক্ষ হাটের সামনে মুন্সীগঞ্জের খামারীদের জন্য বিশেষ স্থান রেখে দেন। ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে গণি মিয়ার হাটে সম্মুখভাগে সামিয়ানার নীচে ঈদের ২ দিন আগে খামারীরা অতি যত্নে পোষা এসব ধবল গরু নিয়ে বিক্রির উদ্দেশে দাঁড়িয়ে যান। মিরকাদিমের ধবল গরুর বৈশিষ্ট হচ্ছে এর সমস্ত শরীর সাদা গোলাপী আভা রয়েছে। চোখের পাপড়ি থেকে শুরু করে পায়ের নখ ও সাদা। দেশীয় প্রজাতির অন্যান্য গরুর চেয়ে এরা শান্ত প্রকৃতির। ধবল গরুর মাংস খুবই সুস্বাদু।
মিরকাদিম পৌরসভার নগর কসবা এলাকার খামারী স্বপন বাসস’কে জানান, মিরকাদিমের ধবল গরুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তবে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং পশ্চিমা জাতের পছন্দসই ধবল গরু দেশের বিভিন্ন হাট থেকে সংগ্রহ করা বেশ কঠিন হয়ে গেছে।
কাঁচা ঘাস ছাড়া শুধুমাত্র দানাদার খাদ্য খাওয়ানোর ফলে একেকটি গরুর পেছনে প্রতিদিন ৫শ’ টাকা খরচ করতে হয়। পূর্বে মিরকাদিম ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২শতাধিক খামারী থাকলেও বর্তমানে গরু লালন-পালন যুক্ত খামারী ১০-১৫ তে নেমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধবল গরু কিনে এনে ১ বছর লালন পালন করা হয়। লালন পালনে খরচ বেশি হওয়ায় এখন গুটি কয়েক খামারী বাপ দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। অনেকে অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় খামারীর সংখ্যা কমে গেছে।
মিরকাদিম পৌরসভার কাগজি পাড়ার মো. সফিন দেওয়ান বাসস’কে জানান, মিরকাদিমের ডাল, তেল, ধানের মিল হতে সংগ্রহ করা খুদ খৈল, ভুষি, বুট, চালের খুদ, সিদ্ধ ভাত, গমের ভূসি. দানা রাব (মিষ্টিগুড়) সহ নানা ধরনের দানাদার গো-খাদ্য খাওয়ানো হয়। খামারের সাদা রংয়ের গরু গুলোকে অতি যত্ন সহকারে পরম মমতায় নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করা হয়। কোন ধরনের ওষুধ কিংবা ইঞ্জেকশন না দিয়ে বাড়ির গোয়াল ঘরে পরম যত্নে লালন-পালন করে মোটা-তাজা করা হয়। এর ফলে এসব গরু দেখতে যেমন আকর্ষনীয় তেমনি মাংসও বেশ সুস্বাদু।
ঢাকার নাজিরাবাজারে কাপড় ব্যবসায়ী মো. ওমর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিরকাদিম এসেছেন ধবল গরু কিনতে।
তিনি বাসস’কে জানান প্রায় ৫০ বছর যাবৎ তাদের পরিবারের পূর্ব পুরুষরা এখান থেকে ধবল গরু কিনে কোরবানি দেন। এখানকার ধবল গরু দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি এর মাংস খুবই সুস্বাদু।
শাহীন এগ্রোফার্মের মালিক মো. শাহীন জানান, তিনি এ বছর প্রায় ৬০টি ধবল গরু কোরবানির জন্য প্রস্তত রেখেছেন। পুরান ঢাকার অনেক ক্রেতা এরইমধ্যে বায়না করে গেছেন। ঢাকার রহমতগঞ্জের গণি মিয়ার হাটে এখনো মিরকাদিমের ধবল গরুর অনেক চাহিদা বেশি।
শাহীন এগ্রোফার্মে প্রায় ১০ বছর যাবৎ কাজ করেন হাবিবুর রহমান। তিনি বলেছেন, ঈদের কয়েকদিন আগে ধবল গরু গণি মিয়ার হাটে নিয়ে যাবো। তিনি বলেন, গরুগুলোকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেন। নিয়মিত গোসল করাতে হয় এবং দিনে ২/৩ বার খাবার দিতে হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এম এ জলিল বলেন, জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় হতে ধবল গরুর খামারীদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া কৃমিনাশক ওষুধ সরবরাহ এবং টিকা দেয়া হয়।