বাসস
  ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৩৬

১৭ বছরের ভুল জ্বালানি নীতির কারণে ভুগছে চট্টগ্রাম: এরশাদ উল্লাহ, এমপি 

ছবি: বাসস

চট্টগ্রাম, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): চট্টগ্রামে চলমান গ্যাস সংকট শিগগিরই  কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। 

তিনি বলেন, ‘ইরান-মার্কিন যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত এলএনজির (লিক্যুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) অনেক জাহাজ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসতে পারছে না। এরই মধ্যে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এই দুই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে।’

তিনি আজ বিকেলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিনসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট ও উত্তরণের উপায়’ নিয়ে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন।

মতবিনিময় সভায় এরশাদ উল্লাহ, এমপি বলেন, বিগত ১৭ বছরের ভুল জ্বালানি নীতির কারণে দেশের গ্যাস সরবরাহ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতি ঘনফুট মাত্র ১৩ ডলারে কেনা যেত, এখন তার দর গিয়ে ঠেকেছে ২৭ ডলারে। টাকার হিসেবে সরকারের প্রতি ঘনফুট গ্যাস আমদানিতে ব্যয় হয় ১২১ টাকা অথচ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে প্রতি ঘনফুট ২৩ টাকায়। প্রতি ঘনফুটে প্রায় ১০০ টাকা ভর্তুকি দিয়েও সরকার জনগণকে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর ব্যয় চাপ বাড়ায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে জ্বালানি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, চট্টগ্রাম ঘিরে আরও এলএনজি টার্মিনাল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে গেলে শিগগিরই  চলমান সংকট কেটে যেতে পারে। 

চট্টগ্রামবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকট সাময়িক। সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।’

সভায় কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। 

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জাতীয় পর্যায়েই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে ৯ থেকে ১০টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে গত মাসে এসেছে ৬টি জাহাজ। চলতি মাসে পেট্রোবাংলা থেকে কেজিডিসিএলকে প্রায় ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ২৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ চট্টগ্রামে মোট চাহিদা প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রতিদিনই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। 

কেজিডিসিএল এমডি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে এসব কার্গো সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৩টি এলএনজি কার্গো বাতিল হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
আলোচনায় চট্টগ্রামে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের আগের পরিস্থিতিও উঠে আসে। 

কেজিডিসিএল এমডি জানান, আগে সিলেট, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমেছে। বিপরীতে শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। 

দেশীয় উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এরশাদ উল্লাহ, এমপি বলেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো। জাতীয় পর্যায়ে যত গ্যাস পাওয়া যায়, সেখান থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। গত ১৫ বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও বঙ্গোপসাগরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও অফশোর ড্রিলিং হয়নি। ফলে দেশের নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বিগত সরকারের ভুল জ্বালানি নীতির ফলে আজ দেশের জনগণকে এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান কেজিডিসিএল এমডি। তিনি বলেন, দেশে মোট ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি কূপ ইতোমধ্যে খনন করা হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট  গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

নতুন গ্যাসের সন্ধানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় টু-ডি সিসমিক সার্ভে এবং প্রায় ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভের কাজ চলছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে।

তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ আরও শক্তিশালী করতে মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নেগোশিয়েশনের কাজ চলছে।

টার্মিনালটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট  গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্যাসের সুষ্ঠু বিতরণ, সিস্টেম লস কমানো এবং বকেয়া আদায়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কেজিডিসিএল এমডি প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন। 

তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত গ্যাস সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা, সিস্টেম লস সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং বকেয়া আদায় করা কেজিডিসিএলের অন্যতম দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে ১৬টি ভিজিল্যান্স টিম ও পাঁচটি বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও নজরদারি করছে। এর ফলে বর্তমানে কেজিডিসিএলের সিস্টেম লস ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ভবিষ্যতে এটি আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

মতবিনিময় সভায় কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) রইস উদ্দিন আহমেদ, উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং) অনুপম দত্ত, ম্যানেজার (মার্কেটিং) মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজিম উদ্দিনসহ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।