বাসস
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩৪

রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তরুণ কর্মীদের জন্য খাতভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন : গবেষণা

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে- বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তরুণ কর্মীদের জন্য খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট সহায়তা (যেমন: নগদ প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সহায়তা) প্রয়োজন, কোনো ঢালাও বা অভিন্ন নীতি নয়।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর যৌথ পরিচালনায় পরিচালিত এই গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

গবেষণায় বলা হয়, তরুণরা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে কি না, তা নির্ধারণে কর্মসংস্থানের ধরন ও বসবাসের স্থান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরিবহন খাতের তুলনায় তৈরি পোশাক (আরএমজি), কৃষি ও নির্মাণ খাতের তরুণ কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি, যেখানে পোশাক খাতের কর্মীরা সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও আরএমজি খাতের অনেক কর্মী এখনও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও বন্যার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করার কারণে তরুণদের লিঙ্গ বা কর্মসংস্থানের খাত নির্বিশেষে তাদের চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ০.৫ শতাংশেরও কম নির্গমন করে বাংলাদেশ। তবে গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স বা বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও কার্বননির্ভর খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এ খাত থেকে। অন্যদিকে, কৃষি খাতে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪১ শতাংশ নিয়োজিত। ফলে এসব খাতে কর্মরত তরুণরা অর্থনৈতিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জের মুখে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। 

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতে স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশনের কারণে কাজ হারানোর হার যতটা ভাবা হয়, বাস্তবে তার চেয়ে কম। পাশাপাশি, এতে নির্মাণ শ্রমিকদের চরম নাজুক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে, যাদের কোনো ধরনের মজুরি নিরাপত্তা বা দুর্ঘটনাজনিত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই।

অন্যতম আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো আনঅফিসিয়াল বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার না থাকা। এর ফলে যাদের প্রকৃত সহায়তা প্রয়োজন, তাদের চিহ্নিত করা বা লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ কর্মীরা নগদ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং চাকরি প্রাপ্তিতে সহযোগিতাকে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে স্থানান্তর অনুদান ও নতুন ব্যবসার জন্য প্রারম্ভিক মূলধন পাওয়ার বিষয়টিকে তারা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

তবে বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নির্মাণ শ্রমিকরা নগদ সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আরএমজি ও পরিবহন খাতের কর্মীরা চাকরিতে নিয়োগের সহায়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষি খাতের কর্মীরা নগদ সহায়তা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের সমন্বিত ব্যবস্থা পছন্দ করেছেন।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ক্ষেত্রেও খাতভেদে ভিন্নতা দেখা গেছে। কৃষকরা সরকারের ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখলেও পোশাক ও নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তাদের ওপর বেশি ভরসা করেন। অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকরা বেশি নির্ভর করেন তাদের ইউনিয়নের ওপর।

তাই গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত উত্তরণের জন্য একটি একক জাতীয় কৌশল অনুসরণের পরিবর্তে খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট প্রচার ও সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

সানেমের প্রোগ্রাম পরিচালক জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘এই রূপান্তরের ঝুঁকির মুখে তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও বাংলাদেশকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখার উপযুক্ত প্রজন্ম।’

তিনি বলেন, ‘এ কারণেই আমরা বিশেষভাবে তরুণদের কেন্দ্র করে এই তথ্যভিত্তিক গবেষণা করেছি।’

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণ এখন বিশ্বব্যাপী ও জাতীয়ভাবে, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য একটি অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সানেমের গবেষণা অর্থনীতিবিদ ফারহান খান গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে বলেন, ‘প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণ করে যে ঢালাও বা সবার জন্য একই সমাধানের কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘খাতভেদে তরুণ কর্মীদের চাহিদা ভিন্ন। এসব নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তরুণদের কেবল সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে, নীতি নির্ধারণের টেবিলে তাদের প্রকৃত অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত।’

উপকূলীয়, নদীবেষ্টিত ও শহরাঞ্চলকে প্রতিনিধিত্বকারী ৯টি জেলার ৬২৫ জন তরুণ কর্মীকে নিয়ে মাঠপর্যায় ও অনলাইন জরিপ, ১৪টি বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার এবং কর্মশালার মাধ্যমে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তুলে ধরতে এসব জেলা নির্বাচন করা হয়।

গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগদাতা সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।

অংশগ্রহণকারীরা উদীয়মান ও বিলুপ্তপ্রায় চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে সাজানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারি তথ্যভাণ্ডারে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ভবিষ্যতে গবেষণার পরিধিতে পলিটেকনিক শিক্ষার্থী এবং পেশাগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন তারা।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেন, ‘প্রশিক্ষণ যদি প্রকৃত চাকরির সাথে সম্পর্কিত না হয়, তবে তা যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন যা নিয়োগদাতাদের কাছে কার্যকর হবে। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের কেবল সহায়তার পাত্র না বানিয়ে এই উত্তরণ প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।’