বাসস
  ০৬ জুন ২০২৬, ২০:১৫

নাগরিক সম্পৃক্ততায় নগর উন্নয়নে ‘দক্ষিণের জানালা’ উদ্বোধন করলো ডিএসসিসি

ছবি : বাসস

ঢাকা, ৬ জুন, ২০২৬ (বাসস) : নাগরিক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে নগর সমস্যার তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে ‘দক্ষিণের জানালা’ নামে একটি নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।

আজ শনিবার রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ‘দক্ষিণের জানালা’ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও জনসম্পৃক্ত নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগ শুধু সেমিনার বা আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীতে পরিণত করতে হবে। এ কাজে সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

মন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। ‘দক্ষিণের জানালা’ নাগরিকদের শাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার একটি কার্যকর সুযোগ তৈরি করবে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু একই সঙ্গে যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, পয়ঃনিষ্কাশন সংকট, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার বিকল্প নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘দক্ষিণের জানালা’ এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নাগরিক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা একসঙ্গে বসে সমস্যা চিহ্নিত করবেন, বিশ্লেষণ করবেন এবং তথ্যনির্ভর সমাধান প্রস্তাব করবেন। খাতভিত্তিক সেমিনার, টাউন হল সভা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং নাগরিক কমিটির মাধ্যমে আমরা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে চাই।

ডিএসসিসি প্রশাসক আরো বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল আলোচনা নয়, বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করা। আমরা এমন একটি শহর গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নাগরিকরা শুধু সেবাগ্রহীতা নন, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার।’

নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শহরের প্রতিটি নাগরিককে ভাবতে হবেÑ আমার শহর, আমার দায়িত্ব। তাই আমাদের সেøাগানÑ ‘আমি বদলাই, ঢাকা বদলাবে’।

উদ্বোধনী পর্বের পর ‘নাগরিক ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের প্রথম অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা : বাস্তবতা ও করণীয়’। এ অধিবেশনে রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

ডিএসসিসির অঞ্চল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় এ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নেন পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর নির্বাহী পরিচালক এস এম মাহবুবুর রহমান, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর নির্বাহী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন সরকার এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘নগর স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ’। এ অধিবেশনে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ, নগর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ডিএসসিসির উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল এবং আইইডিসিআর-এর মেডিকেল এন্টোমলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রোজিনা আফরোজ।

উভয় অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, জলাবদ্ধতা নিরসন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এসব সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও মত দেন তারা।

সেমিনারের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের জবাব দেন ডিএসসিসি প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বক্তারা আশা করেন, ‘দক্ষিণের জানালা’ নগর সমস্যা সমাধানে নাগরিক সম্পৃক্ততার একটি কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ঢাকা দক্ষিণকে আরো বাসযোগ্য, আধুনিক ও মানবিক নগরীতে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।