শিরোনাম

ঢাকা, ২৪ মে, ২০২৬ (বাসস) : জাপানি ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) কোম্পানি ‘গ্লাফিট’ বাংলাদেশে ৮০০ ইলেকট্রিক বাইক নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশকে তাদের উদ্ভাবনী ইভি ব্যবসায়িক মডেলের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে হোন্ডা’র অন্যতম প্রধান যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মুসাশি’। প্রকল্পটির প্রস্তুতি পর্যালোচনার জন্য মুসাশির প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকা সফর করছেন। এই প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে- চার্জিং এবং ব্যাটারি সোয়াপিং (পরিবর্তন) অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়গুলো।
কার্যক্রম শুরুর অংশ হিসেবে, গত ১৫ জানুয়ারি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে গ্লাফিট বাংলাদেশ লিমিটেড। এ চুক্তির আওতায়, ঢাকা ও অন্যান্য এলাকায় চার্জিং এবং ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রাণ-আরএফএল-এর খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র ‘বেস্ট বাই’-এর নেটওয়ার্কের সাথে যৌথভাবে কাজ করবে গ্লাফিট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই সহযোগিতার মাধ্যমে প্রাণ-আরএফএল-এর বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্কের সাথে গ্লাফিট-এর উন্নত জাপানি ইভি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সিস্টেমের চমৎকার সমন্বয় ঘটবে।
গ্লাফিট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তেইজো নারুমি বাসস-কে বলেন, এই প্রকল্পে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তি এবং একটি ডেডিকেটেড মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মাধ্যমে বাইকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কোম্পানিটি মূলত ডেলিভারি এবং লজিস্টিকস (পণ্য পরিবহন) খাতকে লক্ষ্য করে কাজ করছে, যাতে ব্যবসায়িক পরিচালনা খরচ কমানো এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, পরিবহন চাহিদা বাড়ছে এবং বিশেষ করে ঢাকায় বায়ুদূষণ মোকাবিলার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশের ইভি খাতে প্রবৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
নারুমি আরো বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যা প্রোফাইল একটি বড় সুবিধা। দেশের গড় বয়স প্রায় ২৭ বছর, যা জাপানের বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যার তুলনায় একটি গতিশীল কর্মশক্তি ও ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার তৈরি করছে।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ ইভি ইকোসিস্টেম-সংযুক্ত ডেলিভারি ও লজিস্টিকস সেবার মাধ্যমে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
তবে নারুমি ইভি খাতের জন্য স্পষ্ট সরকারি নীতি ও বিধিমালার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন সম্প্রসারণ আনুষ্ঠানিক নির্মাতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
গ্লাফিট-এর প্রধান কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাটারি ও চার্জিং সিস্টেমের জন্য বিশেষভাবে নিরাপত্তা মান ও নির্দেশিকা প্রণয়নের আহ্বান জানান, যাতে উন্নত ইভি উৎপাদন ও বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত হয়।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোম্পানিটি বাংলাদেশে উৎপাদন সুবিধা স্থাপনের কথা বিবেচনা করতে পারে। কারণ, জাপানের বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা দেশীয় শিল্প উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মুসাশির ওপেন ইনোভেশন ডিরেক্টর আকিরা মাতাগা বলেন, টেকসই নগর পরিবহন প্রসার এবং বাংলাদেশের উদীয়মান ইভি ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মুসাশি গ্লাফিট-কে বাংলাদেশে ব্যবসা চালুর জন্য আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
গ্লাফিট বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং গ্লাফিট জাপান হেডকোয়ার্টারের গ্লোবাল বিজনেস হেড হাসান কামরুল জানান, ঢাকাজুড়ে চার্জিং এবং ব্যাটারি সোয়াপিং (ব্যাটারি পরিবর্তন) অবকাঠামো উন্নয়নে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করেছে গ্লাফিট।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রাণ-আরএফএল পরিচালিত ‘বেস্ট বাই’ আউটলেটগুলোতে ইভি (বৈদ্যুতিক যান) চার্জিং এবং ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন স্থাপন করা হবে।
তিনি আরো জানান, প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটি ডেলিভারি এবং লজিস্টিকস (পণ্য পরিবহন) খাতের ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যার লক্ষ্য শহরে পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আরো দক্ষ এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা।
কামরুল বলেন, এই চার্জিং ও ব্যাটারি সোয়াপিং নেটওয়ার্কে আইওটি (আইওটি) প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা চার্জিং স্টেশন খুঁজে পাবেন, ব্যাটারির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, সোয়াপিং পয়েন্ট বুকিং বা ব্যবহার করতে পারবেন এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইভি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
তিনি জানান, শক্তিশালী বাজারের সম্ভাবনা, জনসংখ্যাগত সুবিধা এবং পরিবেশগত জরুরি প্রয়োজনের কারণে এই ব্যবসায়িক মডেলের জন্য প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় জনসংখ্যা ঘনত্বের কারণে দক্ষ দুই চাকার যানবাহনের বিশাল চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি, শহরের মারাত্মক বায়ু দূষণ পরিস্থিতি আরো পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
হাসান কামরুল এই প্রকল্পের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান ডেলিভারি ও লজিস্টিকস খাতের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা এই ধরনের উদ্ভাবনী পরিবহন সেবার প্রসারের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
তিনি বৈদ্যুতিক যান (ইভি) শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির ওপর জোর দেন, বিশেষ করে ব্যাটারির নিরাপত্তা এবং উৎপাদন মানদণ্ডর বিষয়ে।
তার মতে, একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে তা বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে এবং এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে।
ব্যবসায়িক মূলনীতির কথা উল্লেখ করে কামরুল বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নাগরিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, যাত্রীদের পরিবহন খরচ কমাতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে কাজ করবে।
২০১৭ সালে জাপানের ওয়াকায়ামায় প্রতিষ্ঠিত গ্লাফিট ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক পরিবহন যেমন- ফোল্ডিং ইলেকট্রিক মোপেড এবং সেলফ-স্ট্যাবিলাইজিং যানবাহন তৈরিতে বিশেষায়িত একটি প্রতিষ্ঠান। প্যানাসনিক এবং ইয়ামাহা মোটরের মতো বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় কোম্পানিটি তাদের এই টেকসই পরিবহন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করছে।