শিরোনাম

ঢাকা, ২৩ মে, ২০২৬ (বাসস) : ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের’। কবিরা এই পৃথিবীকে নবজাতকের বাসযোগ্য করে যাওয়ার অঙ্গীকার করে সেই কবে এ কবিতা লিখেছেন, আর স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্টরা সচেতনতা বাড়াতে সেই নব্বইয়ের দশকেই শহর থেকে গ্রামে পৌঁছে দিয়েছেন বিখ্যাত স্লোগান ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’।
জন্মের পরপরই নবজাতককে দেওয়া হয় বিসিজি, যা রক্ষা দেয় যক্ষ্মা থেকে। দেওয়া হয় পোলিও টিকা।
জন্ডিস প্রতিরোধে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হয় পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, ওপিভি, আইপিভি, এমআরের মতো বিভিন্ন রোগপ্রতিরোধী টিকা। এসব টিকার মধ্যে বেশ কয়েকটিই নিউমোনিয়া, হাম-রুবেলার মতো প্রাণঘাতী রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে।
অত্যাধুনিক চিকিৎসার এই যুগে গত মার্চে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের সংস্পর্শ থেকে দূরে (আইসোলেশনে) রাখতে হয়। গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই শত শত শিশু মারা যাচ্ছে হামের প্রকোপে। প্রায় ৫০০ শিশুর মৃত্যুর কারণ বলা হচ্ছে হাম ও হামের উপসর্গ।
১২ দিন বয়সী নবজাতক থেকে শুরু করে ১২ বছরের কিশোরীও হাসপাতালে কাতরাচ্ছে হামের জ্বরে। উচ্চ তাপমাত্রা আর শরীরব্যথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না অভিভাবকেরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে উঠে এসেছে, হাসপাতালগুলো থেকেও সংক্রমিত হচ্ছে শিশুরা।
ধূসর একটি চাদরে মোড়ানো ছোট্ট একটি শিশু, তাকে কোলে নিয়ে ছুটে চলেছেন একজন যুবক।
রাজধানী ঢাকার মহাখালী এলাকা থেকে তোলা এমনই একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেটি দাগ কেটেছে অনেকের মনে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা ওই ছবিতে চাদরে মোড়ানো যে শিশুটির নিথর দেহ দেখা গেছে, তার নাম মো. সাদমান। তিন বছর বয়সী শিশুটি মঙ্গলবার হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা যায়।
৮ মাস ১৮ দিনের শিশু তাজিমের মৃত্যু হয়েছে গত ২২ এপ্রিল। ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির বিয়ের ১১ বছর পর জন্ম হয় তাজিমের। তাজিমের চিকিৎসাধীন ছবি কাঁদিয়েছে দেশবাসীকে।
গত মার্চ মাস থেকে তাজিমকে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন ফারজানা ইসলাম। প্রথমে নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তারপর হাম। চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছিলেন এই দম্পতি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মিঠামইনের ১২ বছরের কিশোরী আঁখির যন্ত্রণাকাতর ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে পত্রিকা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আশপাশে সবাই এখন মৃত্যু-আতঙ্কে। কখন হাম আক্রান্ত সন্তানটিকে শেষ নিঃশ্বাস নিতে হয় এমন আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবকেরা। এই হাসপাতালে এখন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে আরও অনেক শিশু। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ৪০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হাম শনাক্ত হওয়া ৭টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
১২ দিন বয়সী শিশু আজহারুল ইসলাম। পিতা আশরাফুল ইসলাম ও মা মাজেদা বেগমের সংসারে ফুটফুটে শিশুটির জন্ম হয়। বাবার নামের সঙ্গে মিল রেখে সন্তানের নাম রাখা হয় আজহারুল ইসলাম। শিশুটির জন্মের আনন্দ উদযাপন শুরুর আগেই আতঙ্কে পরিবারটি। পৃথিবীর আলো-বাতাসের স্বাদ ভালোভাবে গ্রহণ করার আগেই বাঁচার লড়াই শুরু করেছে এই শিশু ও তার পরিবার। গত ১৭ মে হামে আক্রান্ত হয় আজহারুল।
এখানেই শেষ নয়, আইসিইউ না থাকায় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতে হয় শিশুটির পরিবারকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘হাম একটি ভাইরাসজনিত অতি সংক্রামক রোগ। কেবলমাত্র টিকাদানের মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন যাবৎ শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি চমৎকারভাবে চলছিল।’ কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
লেলিন চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনকালে প্রায় ৪৫-৫০ লাখ শিশু টিকাদানের বাইরে ছিটকে পড়ে। হামের প্রকোপে এই শিশুরা আক্রান্ত হয়। ফলে গত অনেক বছরে যা হয়নি, এবার হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সেটাই হলো; অর্থাৎ হামে কয়েক শ শিশু মারা গেল। হামের এই ভয়াবহ প্রকোপ দেখে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যেসব পরিবারে ছোট শিশু আছে, তারা তীব্র শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার হাম হতে পারে। তবে সাধারণত বড়দের ক্ষেত্রে হাম শিশুদের মতো মারাত্মক হয় না।
তিনি বলেন, ‘হামের প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের শরীরের সুরক্ষাশক্তি বা ইমিউনিটি ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেওয়া। ফলে হাম থেকে ভালো হওয়ার পর শিশুর শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়ে থাকে। হামে আক্রান্ত শিশুর অনেক জটিলতা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, চোখের প্রদাহজনিত অন্ধত্ব ইত্যাদি।’
তিনি জানান, হামের মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বিপর্যস্ত করে ফেলে। ফলে হামের রোগী সেরে ওঠার পরও অনেক দিন পর্যন্ত তার অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। পুষ্টির অভাবে ভুগছে এমন শিশুর শরীরে হামের সংক্রমণের তীব্রতা এবং তাদের মৃত্যুহার পুষ্টিমানসম্পন্ন শিশুর তুলনায় অনেক গুণ বেশি হয়ে থাকে। এজন্য টিকাদানের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টিমান নিশ্চিত করা দরকার।
‘বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকাদান শুরু করেছে। আমরা মনে করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যে হামের প্রকোপ কমতে শুরু করবে’ বলেন তিনি।
সরকারি ও বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার জনের মতো ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে হাম ও এর উপসর্গে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকার বাইরে থাকা শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই বছরে শিশুদের হাম-রুবেলার (এমআর) প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, টিকার প্রতি কিছুটা অনীহা এবং টিকার ঘাটতির কারণে প্রায় কোটি খানেক শিশু রোগপ্রতিরোধক্ষমতার বাইরে রয়ে গেছে।
ঢাকা বিভাগে বিশেষ করে জনবহুল বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুরে এবং রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।